কিয়েভের বৃহৎ অংশে রাশিয়ার বিমান হামলার ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে; তাপমাত্রা মাইনাস ৬ থেকে মাইনাস ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে যাওয়ায় শহরের বহু বাসিন্দা হিটিং সিস্টেম ছাড়া রাত্রি কাটাচ্ছেন। শহরের মেয়র ভিটালি ক্লিটসকো মঙ্গলবার সকালে জানিয়েছেন যে প্রায় ছয় হাজার আবাসিক ভবনে তাপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে এবং শীতল বাতাসে গৃহস্থালির জীবন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেয়র ক্লিটসকো উল্লেখ করেন, রাশিয়ার সাম্প্রতিক আক্রমণে বিদ্যুৎ গ্রিডের প্রধান ট্রান্সফরমারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে শহরের বেশিরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। তাপের অভাবে গরম পানির ব্যবস্থা ও হিটিং সিস্টেম কাজ করছে না, ফলে শীতল রাতে গৃহস্থালিরা অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করে গরম করার চেষ্টা করছেন।
মঙ্গলবার কিয়েভে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মাইনাস ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস (২৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এবং সর্বনিম্ন মাইনাস ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট) রেকর্ড করা হয়েছে। এই তাপমাত্রা শীতের কঠিন সময়ে শহরের অবকাঠামোকে আরও বেশি চাপের মধ্যে ফেলেছে, বিশেষ করে যেসব পরিবার পুরনো হিটিং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন।
সোমবার রাতের রাশিয়ান হামলায় কমপক্ষে একজন নারী আহত হয়েছেন; তিনি জরুরি সেবার মাধ্যমে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মেয়র ক্লিটসকো জানান, শহরের পৌর ও জ্বালানি পরিষেবা সরবরাহকারী সংস্থাগুলো তাত্ক্ষণিকভাবে তাপ, পানি ও বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করেছে এবং আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মূল নেটওয়ার্ক পুনরায় চালু করার লক্ষ্য রাখছে।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া পূর্ণমাত্রায় ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করার পর থেকে দেশের জ্বালানি গ্রিডে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ চালিয়ে আসছে। এই ধারাবাহিকতা কিয়েভের মতো বড় শহরে মৌলিক সেবার ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে এবং শীতের মৌসুমে মানবিক সংকটের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাশিয়ার এই ধরনের অবকাঠামোগত আক্রমণকে ব্যাপকভাবে নিন্দা করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ প্রতিনিধি জুলিয়া রেজি-সোয়েটা রাশিয়ার সিভিল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার নীতি কঠোরভাবে নিন্দা করেছেন এবং ইউক্রেনকে জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রিক পার্লসও একই রকম মন্তব্য করে রাশিয়ার শীতলায়ন কৌশলকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
নাটো সদস্য দেশগুলোও কিয়েভের বিদ্যুৎ সংকটের প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে রাশিয়ার অবৈধ আক্রমণ বন্ধের জন্য অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা উল্লেখ করেছে। বিশেষ করে জার্মানি ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাশিয়ার এ ধরনের সাইবার ও শারীরিক আক্রমণকে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, শীতের তীব্রতা এবং বিদ্যুৎ ঘাটতি ইউক্রেনের সামরিক ও নাগরিক উভয় ক্ষেত্রেই চাপ বাড়াবে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা গুলো ইতিমধ্যে কিয়েভে তাপ সরবরাহের জন্য অস্থায়ী হিটিং ইউনিট এবং জরুরি শেল্টার স্থাপনের পরিকল্পনা চালু করেছে। এই উদ্যোগগুলো রাশিয়ার অবকাঠামো আক্রমণের ফলে সৃষ্ট মানবিক সংকটকে কমাতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিয়েভের বর্তমান পরিস্থিতি পূর্বের আক্রমণগুলোর সঙ্গে তুলনা করা যায়, যখন ২০২৩ সালের শীতকালে রাশিয়ার ড্রোন আক্রমণ শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করেছিল। তবে এইবারের আক্রমণটি বিদ্যুৎ গ্রিডের মূল কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে, ফলে পুনরুদ্ধার সময়সীমা দীর্ঘতর হতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে রাশিয়ার অতিরিক্ত আক্রমণ বা বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন।
কিয়েভের মেয়র ক্লিটসকো শেষ মন্তব্যে বলেন, শহরের সেবা কর্মীরা রাতারাতি কাজ করে তাপ, পানি ও বিদ্যুৎ পুনরায় চালু করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন এবং নাগরিকদের নিরাপদে শীত পার করার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। সরকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এই শীতের কঠিন সময়ে কিয়েভের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



