মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে ৩৬ জন বাংলাদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠিয়েছে। এদের অধিকাংশের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র, তবে তারা অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করায় শরণার্থী আবেদন প্রত্যাখ্যানের পর দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
ফেরতপ্রাপ্তদের মধ্যে ২১ জন নোয়াখালির, দুইজন লক্ষ্মীপুরের এবং মুনশিগঞ্জ, ঢাকা, লালমনিরহাট, শারিয়তপুর, বরগুনা, ফেনি, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও নেত্রকোনার প্রতিটি জেলা থেকে একজন করে ছিলেন। এদের মধ্যে একজন নারী ছিলেন।
ব্র্যাকের প্রকাশিত প্রেস রিলিজে জানানো হয়েছে যে, অধিকাংশ ফেরতপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রথমে ব্রাজিলে বৈধভাবে গিয়েছিলেন, যা শ্রম ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) অনুমোদন করেছিল। পরবর্তীতে তারা মেক্সিকো অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে অননুমোদিতভাবে প্রবেশের চেষ্টা করেন এবং শরণার্থী হিসেবে আবেদন করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আবেদন প্রত্যাখ্যানের ফলে তারা দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, এই ৩৬ জনের বেশিরভাগই বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিশাল অর্থ ব্যয় করে ছিলেন। নোয়াখালির এক ফেরতপ্রাপ্ত জাহিদুল ইসলাম জানান, তিনি ব্রোকারদের কাছে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা প্রদান করে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর আশা করেছিলেন। গাজীপুরের সুলতানা আক্তারও ৩০ লক্ষ টাকা ব্রোকারকে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি ব্রাজিলের মাধ্যমে মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারেন। অন্যান্য ফেরতপ্রাপ্তদের ব্যয় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকার মধ্যে ছিল।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও যুব প্ল্যাটফর্মের সহ-পরিচালক শারিফুল হাসান উল্লেখ করেন, ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ফেরতপ্রাপ্তদের জন্য ব্র্যাক জরুরি সহায়তা ও পরিবহন ব্যবস্থা করে। এই সেবা প্রদান করা হয়েছিল বিদেশে কাজ করা শ্রমিকদের কল্যাণ ডেস্ক ও বিমান নিরাপত্তা বিভাগের সমন্বয়ে। তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের প্রেরণকারী সংস্থা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জড়িত সকলকে দায়বদ্ধ করা উচিত।
২০২৫ সালে BMET অনুমোদন পেয়ে ১,৩২০ জন বাংলাদেশি ব্রাজিলে গিয়েছিলেন, যার মধ্যে ৯৫১ জন নোয়াখালির বাসিন্দা। অনুমান করা হয়, এদের মধ্যে অনেকেই মেক্সিকো রুটে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। শারিফুল এই পরিস্থিতি নিয়ে সরকারকে সতর্ক করেন যে, ভবিষ্যতে শ্রমিকদের ব্রাজিলের মতো গন্তব্যে পাঠানোর আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী বিরোধী নীতি সম্প্রতি তীব্রতর হয়েছে, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে শরণার্থী ও অবৈধ প্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই নীতি অনুসরণে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আদালত ও আইনি বিভাগ শরণার্থী আবেদন দ্রুত পর্যালোচনা করে প্রত্যাখ্যানের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে, বহু বাংলাদেশি শ্রমিকের স্বপ্ন ভেঙে গিয়ে তারা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকায় কাজের সুযোগের সন্ধানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ছে। তবে, ব্রাজিলে অনুমোদিত ভ্রমণ ও মেক্সিকো রুটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের প্রচেষ্টা প্রায়ই আইনি জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলেন, “বৈধ কর্মসংস্থান চুক্তি ও স্বচ্ছ ভিসা প্রক্রিয়া ছাড়া অবৈধ রুটে যাওয়া শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, দেশীয় ও গন্তব্য দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়ায়।”
এই ঘটনার পর, বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আহ্বান জানানো হয়েছে যে, বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়ানো উচিত। একই সঙ্গে, শ্রমিকদের সঠিক তথ্য প্রদান, ব্রোকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক ক্ষতি কমাতে সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা জোর দেওয়া হয়েছে।
ব্র্যাকের সহায়তা দল ফেরতপ্রাপ্তদের জন্য অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা, আর্থিক পরামর্শ ও পুনর্বাসন প্রোগ্রাম চালু করেছে। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গড়ে তোলার পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অভিবাসন নীতি, শ্রমিক নিরাপত্তা ও বৈধ কর্মসংস্থান সুযোগের গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরেছে, যা ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারক ও শ্রমিক উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।



