যুক্তরাজ্য ২০২৫ সালের মে মাসে কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়া এখনও দু’দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘চরম বোকামি’ বলে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা করেন।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জের হস্তান্তর ২০২৫ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে, তবে ডিয়েগো গার্সিয়ার সামরিক সুবিধা পরবর্তী ৯৯ বছর পর্যন্ত যুক্তরাজ্য‑যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ব্যবস্থাপনায় থাকবে। ট্রাম্পের মতে, এই সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা না থাকায় এটি অযৌক্তিক বলে বিবেচিত।
ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে লিখে জানান, যুক্তরাজ্য ন্যাটো মিত্র হিসেবে নিজেদের ‘মেধাবী’ বলে দাবি করলেও ডিয়েগো গার্সিয়া মরিশাসকে দান করার পরিকল্পনা করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত। তিনি যুক্তি দেন, কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়া এই পদক্ষেপ নেওয়া যুক্তরাজ্যের কৌশলগত দুর্বলতা প্রকাশ করে।
প্রেসিডেন্টের মন্তব্যে তিনি চীনা ও রাশিয়ান শক্তিগুলোর প্রতি সতর্কতা প্রকাশ করেন, যে তারা যুক্তরাজ্যের এই দুর্বলতাকে লক্ষ্য করে। ট্রাম্পের মতে, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো কেবল শক্তি ও প্রভাবকে সম্মান করে, তাই যুক্তরাজ্যের এমন সিদ্ধান্ত তাদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
ট্রাম্পের বিশ্লেষণে যুক্তরাজ্যের চাগোস হস্তান্তরকে গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের ইচ্ছার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, যদি যুক্তরাজ্য ডিয়েগো গার্সিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ত্যাগ করতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ডের মতো কৌশলগত এলাকা নিজের দখলে রাখা অপরিহার্য।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মরিশাসের স্বায়ত্তশাসন পুনরুদ্ধার হবে, তবে ডিয়েগো গার্সিয়ার সামরিক অবকাঠামো যুক্তরাজ্য‑যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এই ব্যবস্থা উভয় দেশের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য গৃহীত হয়েছে, যদিও তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন তুলেছে।
মরিশাস সরকার ১৯৬৮ সালে ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের স্বায়ত্তশাসন দাবি করে আসছে। তারা দাবি করে, স্বাধীনতার সময়ই এই দ্বীপগুলো থেকে তাদের হাত তোলা হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক দাবি এখন চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হচ্ছে।
ট্রাম্পের সমালোচনার আগে, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের অধীনস্থ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত। ২০২৫ সালের মে মাসে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় মার্কো রুবিও, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এটিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে প্রশংসা করেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর চিফ সেক্রেটারি ড্যারেন জোনসের মতে, চুক্তি দেশের কূটনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তবে তিনি যুক্তি দেন যে ব্রিটেনের কৌশলগত অবস্থান সহজে বদলানো যায় না। জোনসের মন্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘোরানো সম্ভব নয়, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নীতি নির্দেশ করে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের ফলে যুক্তরাজ্য‑যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারিত্বে নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে ডিয়েগো গার্সিয়ার সামরিক ঘাঁটি কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে উভয় দেশের নীতি নির্ধারকরা পুনরায় বিবেচনা করতে পারেন।
অন্যদিকে, মরিশাসের জন্য চাগোসের স্বায়ত্তশাসন পুনরুদ্ধার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। দেশটি এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার ভূখণ্ডগত দাবি শক্তিশালী করতে পারবে এবং দ্বীপপুঞ্জের সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণে নতুন নীতি গঠন করতে পারবে।
যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তকে সরকারের কূটনৈতিক কৌশলের একটি পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তারা উল্লেখ করেন, চুক্তি যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ও গ্লোবাল অবস্থানকে পুনর্গঠন করতে পারে, তবে একই সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করবে।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে, কারণ ট্রাম্পের মন্তব্যে এই অঞ্চলকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি যুক্তরাজ্য চাগোসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ত্যাগ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অন্যান্য কৌশলগত স্থানের অধিগ্রহণের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
সারসংক্ষেপে, চাগোস দ্বীপপুঞ্জের মরিশাসে হস্তান্তর একটি জটিল কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, যার ফলে যুক্তরাজ্য‑যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা এই বিষয়কে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যৎ নীতি গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।



