যুক্তরাজ্য ভারত মহাসাগরে অবস্থিত চাগোস দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করতে সম্মত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই সিদ্ধান্তকে সরকারী নীতি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একই দিনে সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত পোস্টে এই পরিকল্পনাকে “অত্যন্ত বোকামি” এবং “জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি” বলে সমালোচনা করেন।
ট্রাম্পের মন্তব্যটি সোমবার, ২০ জানুয়ারি, তার নিজস্ব নেটওয়ার্কে প্রকাশিত হয়। তিনি যুক্তরাজ্যকে “আমাদের বুদ্ধিমান ন্যাটো মিত্র” বলে উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন কেন তারা ডিগো গার্সিয়া দ্বীপ, যেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত, কোনো স্পষ্ট কারণ ব্যতীত মরিশাসের হাতে হস্তান্তর করতে চায়। ট্রাম্পের মতে, এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের বিপরীতে যায় এবং তা অবিলম্বে সংশোধন করা দরকার।
প্রশাসনের পূর্ববর্তী অবস্থানকে উল্লেখ করে ট্রাম্প জানান, মে ২০২৫-এ চাগোস দ্বীপপুঞ্জের হস্তান্তর চুক্তি ঘোষণার সময় তার সরকার এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও এটিকে “ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন” হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবে এখন তিনি সম্পূর্ণভাবে মত পরিবর্তন করে, যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্তকে “অত্যন্ত দুর্বলতা” বলে চিহ্নিত করেন এবং চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোকে এই দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের সমালোচনার পাশাপাশি তিনি ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দেন, যদি ব্রিটেন চাগোস হস্তান্তরে এমন পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে গ্রিনল্যান্ডের মতো কৌশলগত অঞ্চল কেনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও অপরিহার্য। এই মন্তব্যে তিনি ডেনমার্ক ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
ব্রিটিশ সরকার এই তীব্র সমালোচনার মুখে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংকটে পড়েছে। স্টারমার, যিনি মাত্র এক দিন আগে ডাউনিং স্ট্রিটে ট্রাম্পের সঙ্গে “শান্ত ও গভীর সম্পর্ক” বজায় রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন, এখন ট্রাম্পের উল্টো মন্তব্যের মুখে কঠিন অবস্থানে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের এই হঠাৎ পরিবর্তন ব্রিটেনের কূটনৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক সুনামকে আঘাত করবে।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জের হস্তান্তর পরিকল্পনা ১৯৬৫ সালে যুক্তরাজ্য দ্বারা গৃহীত হয় এবং পরে ১৯৭১ সালে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি গোপন চুক্তি অনুযায়ী ডিগো গার্সিয়া দ্বীপে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত হয়। আন্তর্জাতিক আদালতে ২০১৯ সালে চাগোসের মালিকানা মরিশাসেরই হওয়া উচিত বলে রায় দেওয়া হয়। এই রায়ের পর থেকে যুক্তরাজ্য ও মরিশাসের মধ্যে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছিল, যা এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে সমন্বয় ও কৌশলগত স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ট্রাম্পের অবস্থান ন্যাটো গঠনের মৌলিক নীতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ, যেখানে মিত্র দেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন ও পারস্পরিক সম্মানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য সরকার দাবি করে যে হস্তান্তর আন্তর্জাতিক আইনের অনুসরণে এবং মরিশাসের স্বায়ত্তশাসনকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য করা হয়েছে।
ভবিষ্যতে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের শাসন কীভাবে গঠিত হবে তা নির্ভর করবে যুক্তরাজ্য ও মরিশাসের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির শর্তের উপর। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলগত অবস্থান রক্ষা করার জন্য ডিগো গার্সিয়ার ব্যবহারে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রাম্পের এই তীব্র প্রতিবাদ যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক দলকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে ফেলবে এবং ন্যাটো গঠনেও পুনর্বিবেচনার দরকার হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। চাগোসের হস্তান্তরকে আন্তর্জাতিক আইনের সঠিক প্রয়োগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগকে উপেক্ষা করা যায় না। উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা ও সংলাপের মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা হবে, যাতে অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং মিত্র দেশগুলোর পারস্পরিক বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।



