নতুন দিল্লি—ব্রিটিশ ভারতের শাসন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) মঙ্গলবার নিতিন নবীনকে সর্বজনীন সভাপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করায়, দলটি দেশের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য বিহারের কম পরিচিত একজন বিধায়কের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। ৪৫ বছর বয়সী নবীন, যিনি পূর্বে বিহারের মন্ত্রী ও পাঁচবারের বিধায়ক হিসেবে কাজ করেছেন, তিন বছর মেয়াদে দলটির শীর্ষ পদে দায়িত্ব নেবেন। এই পদবিন্যাসের পেছনে দলটি তরুণ ভোটারদের সমর্থন জোরদার করার কৌশলগত পরিকল্পনা চালু করেছে, যা রায়টার্সের বিশ্লেষণে প্রজন্মগত পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিজেপি সদর দফতরে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠানটি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই সম্পন্ন হয়, যেখানে বিদায়ী সভাপতি জে.পি. নাড্ডার (৬৫) তার দায়িত্ব নবীনকে হস্তান্তর করেন। নবীনকে সোমবার সন্ধ্যায় একক ভোটে ১২তম সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়, এবং তার পূর্ববর্তী পদ ছিল ডিসেম্বর মাসে কার্যনির্বাহী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা। সেই সময় থেকে অনুমান করা হচ্ছিল, তিনি পরবর্তী সর্বোচ্চ পদে উন্নীত হবেন, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে।
নিতিন নবীন বিহারের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন; তিনি একাধিকবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন এবং রাজ্য সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার যদিও বিহারের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ, তবু তিনি কেন্দ্রীয় স্তরে পার্টির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন, যা তাকে দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক মঞ্চে পরিচিতি এনে দিয়েছে। নবীনকে বিহারের কম পরিচিত অঞ্চল থেকে নির্বাচন করা দলটির অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্র্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিজেপি কার্যনির্বাহী সভাপতি হিসেবে নবীনকে ডিসেম্বর মাসে দায়িত্ব দেওয়া হয়, এবং তখন থেকেই তার নেতৃত্বে পার্টি বিভিন্ন স্তরে কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তার নেতৃত্বে পার্টি বহু রাজ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করেছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ভিত্তি গড়ে তুলেছে। নবীনকে নতুন সভাপতি হিসেবে বেছে নেওয়ার পর, পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতারা তার পক্ষে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে সমর্থন জানিয়েছেন।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে কয়েকশ কর্মী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পার্টির পূর্বের চার সভাপতি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মোদি নবীনকে পার্টির ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে বলার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন, যেখানে তিনি বলেন, “যখন পার্টির বিষয় আসে, আমি কর্মী এবং নবীন আমার ঊর্ধ্বতন।” এই মন্তব্য দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের কাঠামোকে তুলে ধরেছে।
নবীন শপথের পর মোদির প্রশংসা করে বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে “প্রজন্মের পথপ্রদর্শক” হিসেবে উল্লেখ করে তরুণদের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি যুবক ও যুবতীদের জন্য রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে পার্টির নীতি ও কর্মসূচি শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেন। তার বক্তব্যে পার্টির নতুন দিকনির্দেশনা ও তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ইচ্ছা স্পষ্ট হয়েছে।
ভোটার গঠন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের প্রায় একশো কোটি ভোটারদের মধ্যে ৪০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে। এই বৃহৎ তরুণ ভোটার গোষ্ঠীই পার্টির ভবিষ্যৎ জয় নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই নবীনকে নতুন সভাপতি হিসেবে বেছে নেওয়া পার্টির তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
বিজেপি দশ বছর ধরে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে জোটের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিস্থিতি পার্টিকে বিভিন্ন রাজ্য ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটের সঙ্গে সমন্বয় করতে বাধ্য করেছে, যাতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে। নবীনকে নতুন নেতা হিসেবে গৃহীত করা এই জোটের মধ্যে পার্টির অবস্থান শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, তামিলনাড়ু এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে ভোটের ফলাফল পার্টির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। নবীন এই নির্বাচনের প্রস্তুতিতে পার্টির কৌশলগত পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করার দায়িত্বে আছেন, যেখানে তরুণ ভোটারদের সমর্থন অর্জন প্রধান লক্ষ্য।
বিজেপি নতুন সভাপতি হিসেবে নবীনকে গৃহীত করার ফলে পার্টির অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, পাশাপাশি তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের নতুন দিক উন্মোচিত হবে। ভবিষ্যতে পার্টি কীভাবে এই কৌশলকে বাস্তবায়ন করবে এবং জোটের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখবে, তা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
নতুন নেতৃত্বের অধীনে, পার্টি তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন নীতি ও কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা করেছে। এই পরিবর্তনগুলি দেশের বৃহৎ ভোটার গোষ্ঠীর সঙ্গে পার্টির সম্পর্ককে পুনর্গঠন করতে পারে এবং পরবর্তী নির্বাচনী চক্রে পার্টির অবস্থানকে পুনরায় শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।



