ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আজ অনুষ্ঠিত ‘নীতি শীর্ষ ২০২৬’ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াত‑ই‑ইসলামি সরকার গঠনের শর্তে একাধিক নীতি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে। সমাবেশে দেশীয় ও বিদেশি কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ, একাডেমিক, শিল্পপতি, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
দলটি কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ধীরে ধীরে কমানোর পরিকল্পনা জানায়। বর্তমান হারের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদে সরাসরি করকে ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাটকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা ক্ষেত্রে ‘স্মার্ট সামাজিক সিকিউরিটি কার্ড’ চালু করার কথা বলা হয়েছে। এই একক কার্ডে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক কল্যাণের সুবিধা একত্রিত হবে বলে দলটি জানিয়েছে।
শিল্পখাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির হারের কোনো বৃদ্ধি না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী তিন বছর ধরে এই নীতি বজায় রাখার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ থাকা কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে পাবলিক‑প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেল প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে কর্মীদের ১০ শতাংশ শেয়ার প্রদান করা হবে।
কৃষি খাতে কৃষকদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা প্রদান করা হবে বলে দলটি উল্লেখ করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়িয়ে কৃষকদের আর্থিক চাপ কমানো লক্ষ্য।
বেকারত্ব মোকাবেলায় পাঁচ লক্ষ পর্যন্ত স্নাতককে কুয়াল-ই‑হাসানা (Qard‑e‑Hasana) ভিত্তিক সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে। প্রতি মাসে সর্বোচ্চ দশ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ দুই বছর বা চাকরি পাওয়া পর্যন্ত, এই সুবিধা প্রদান করা হবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে এক লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য মাসে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত শিক্ষা ঋণ প্রদান করা হবে, যা মেধা ও আর্থিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিতরণ করা হবে। তদুপরি, প্রতি বছর একশো শিক্ষার্থীকে হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজের মতো শীর্ষ আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করা হবে, যাতে নিম্নআয়ের পরিবার থেকে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা সুযোগ পায়।
উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে জামাতে এডেন কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা কলেজকে একত্রিত করে বিশ্বের বৃহত্তম নারী কলেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এই সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানটি নারী শিক্ষার প্রসার ও গুণগত মান উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখবে বলে দলটি আশা প্রকাশ করেছে।
প্রতিপক্ষের কিছু রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষক এই নীতি প্রস্তাবের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা উল্লেখ করেন, কর হ্রাস ও সুদমুক্ত ঋণ পরিকল্পনা আর্থিক দিক থেকে দেশের বাজেটের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং পাবলিক‑প্রাইভেট পার্টনারশিপে শ্রমিকের শেয়ার বণ্টন কীভাবে কার্যকর হবে তা স্পষ্ট নয়। তবে জামাতের প্রতিনিধিরা এসব উদ্বেগের উত্তর হিসেবে নীতি বাস্তবায়নের জন্য স্বচ্ছ আর্থিক পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
দলটি জোর দিয়ে বলেছে, ক্ষমতায় আসলে দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতা বজায় রাখবে এবং নীতি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। এই নীতি শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে উন্মোচিত পরিকল্পনাগুলো আগামী নির্বাচনের পূর্বে ভোটারদের কাছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, জামাতের ‘নীতি শীর্ষ ২০২৬’ সমাবেশে আর্থিক, সামাজিক ও শিক্ষা ক্ষেত্রের ব্যাপক সংস্কার পরিকল্পনা উপস্থাপিত হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদ শক্তিশালীকরণের লক্ষ্য নিয়ে গঠিত। ভবিষ্যতে এই নীতিগুলোর বাস্তবায়ন ও প্রভাব কীভাবে প্রকাশ পাবে, তা রাজনৈতিক পরিবেশ ও জনমতের ওপর নির্ভরশীল থাকবে।



