ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কীর্স স্টার্মার গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে “শান্ত আলোচনা” করার আহ্বান জানিয়ে বিদেশ নীতি চালু করার পর, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমে চাগোস দ্বীপ হস্তান্তর নিয়ে তীব্র বিরোধ প্রকাশের ফলে সরকারকে নতুন কৌশলগত প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
স্টার্মার সরকার পূর্বে ট্রাম্পের প্রতি নির্ভরশীলতা ও বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। এই নীতি তার প্রথম দফায়ই ইউরোপীয় মিত্রদের তুলনায় হোয়াইট হাউসের সঙ্গে শক্তিশালী সংযোগের ইঙ্গিত দিয়েছিল, যা ব্রিটেনের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছিল।
ট্রাম্পের পক্ষ থেকে স্টার্মারকে উন্মুক্তভাবে প্রশংসা করা হয়েছিল, এবং ডাউনিং স্ট্রিটের সূত্র অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের এই উন্নতি ইউরোপীয় মিত্রদের তুলনায় বেশি সুবিধা এনে দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। একই সময়ে, গত বছর ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতি নিয়ে করা চুক্তি স্টার্মার সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে, চাগোস দ্বীপের হস্তান্তর নিয়ে ট্রাম্পের তীব্র প্রতিক্রিয়া সরকারকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সামাজিক মাধ্যমে চাগোস দ্বীপকে মরিশাসকে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধ প্রকাশ করেন, যা পূর্বে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে গঠিত কূটনৈতিক সেতুকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সম্ভাবনা তৈরি করে।
ব্রিটিশ সরকার গত বছর মরিশাসকে চাগোস দ্বীপ হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল এবং এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সমর্থন পেয়েছিল। উভয় দেশই পাঁচ চোখ (Five Eyes) গোয়েন্দা জোটের সদস্য, এবং চুক্তি তাদের নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
মন্ত্রীরা জোর দিয়ে বলেন যে, যুক্তরাজ্যের চাগোস দ্বীপের মালিকানা নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জগুলি ডিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটির কার্যকারিতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ডিয়েগো গার্সিয়া যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বেস, যা ইন্ডো-প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখে।
চুক্তি অনুসারে, হস্তান্তরের পরও যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুবিধা বজায় থাকবে, এবং দীর্ঘমেয়াদে ঘাঁটির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে বলে সরকার দাবি করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, চুক্তি ঘাঁটির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সহায়ক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত বিরোধের পেছনে তার নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থের প্রভাব থাকতে পারে, যা যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক পরিকল্পনাকে অপ্রত্যাশিতভাবে পরিবর্তন করতে পারে। স্টার্মারকে এখন এই পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা তার সরকারকে নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
ব্রিটিশ সরকার চুক্তির বৈধতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পক্ষে যুক্তি দিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে কূটনৈতিক সেতু হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্পের বিরোধকে নরম করার চেষ্টা করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করেন। তবে, ট্রাম্পের সরাসরি সামাজিক মিডিয়া মন্তব্যের ফলে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরে নীতি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে পারে।
স্টার্মার সরকার এখন চাগোস দ্বীপ হস্তান্তরের পরিণতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে, সরকার কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাবে এবং একই সঙ্গে ঘাঁটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তা তার কূটনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা হবে।
পরবর্তী সময়ে, যুক্তরাজ্য ও মরিশাসের মধ্যে চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় সমন্বয় কিভাবে হবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। স্টার্মারের কূটনৈতিক কৌশল কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে, তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই পরিস্থিতি স্টার্মার সরকারের জন্য একটি বড় কৌশলগত প্রশ্ন উত্থাপন করেছে: ট্রাম্পের তীব্র বিরোধের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চাগোস দ্বীপ হস্তান্তরের চুক্তি রক্ষা করা সম্ভব হবে কি, নাকি নতুন কূটনৈতিক পথ অনুসন্ধান করতে হবে। এই প্রশ্নের উত্তরই তার সরকারকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।



