স্টকহোমে বসবাসরত চলচ্চিত্র নির্মাতা অ্যাঞ্জেলিকা রুফিয়েরের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘লা বেল আনয়ে’ (ফরাসি ভাষায় ‘দ্য বিউটিফুল ইয়ার’) রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত। এই কাজটি রুফিয়েরের নিজের অতীত, পরিবার, এবং তার কিশোরবেলায় শিক্ষিকার প্রতি গোপন আকর্ষণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রটি স্মৃতি, ক্ষতি এবং আকাঙ্ক্ষার থিমকে স্পর্শ করে, পাশাপাশি ১৯৭০-এর দশকের ফরাসি সিনেমার দৃশ্যাংশও অন্তর্ভুক্ত করেছে।
‘লা বেল আনয়ে’ শিরোনামের অর্থ হল ‘সুন্দর বছর’, যা রুফিয়েরের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়কে প্রতিফলিত করে। চলচ্চিত্রটি একধরনের প্রবন্ধমূলক ডকুমেন্টারি রূপে নির্মিত, যেখানে ব্যক্তিগত স্মৃতিচিত্র এবং ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রের ক্লিপের মিশ্রণ দেখা যায়। রুফিয়েরের মতে, এই প্রকল্পটি তার নিজের অতীতের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের সুযোগ দেয়, যা দর্শকদের নিজস্ব স্মৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে।
রটারড্যাম ফেস্টিভ্যালের ওয়েবসাইটে চলচ্চিত্রটি বর্ণনা করা হয়েছে ‘একটি সূক্ষ্মভাবে বুনে তৈরি, অতীতের আকাঙ্ক্ষা ও বর্তমান স্বকে প্রতিফলিত করা প্রবন্ধ’ হিসেবে, যেখানে ফরাসি সিনেমার নরম গ্ল্যামারও উপস্থিত। এই বর্ণনা অনুসারে, ‘লা বেল আনয়ে’ একক ব্যক্তির অতীত, বর্তমান এবং কল্পিত ভবিষ্যতের বাইরে গিয়ে বিস্তৃত মানসিক দৃশ্যপট তৈরি করে। দর্শকরা এই আবেগময় ভূমিতে নিজেদের অভিজ্ঞতা খুঁজে পেতে পারেন।
রুফিয়েরের পূর্ববর্তী কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্রম হিয়ার টু দেয়ার’, ‘দ্য আদার ওয়ে আরাউন্ড’ (২০১৮) এবং ‘স্ট্রেঞ্জার’ (২০২০) নামে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এই শিরোনামগুলো তাকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রমঞ্চে পরিচিতি এনে দিয়েছে এবং ‘লা বেল আনয়ে’ তৈরির ভিত্তি গড়ে তুলেছে। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য ও পরিচালনা রুফিয়েরেরই হাতে, এবং বিক্রয় কাজটি অড স্লাইস ফিল্মস সংস্থা পরিচালনা করছে। সুইডেনে চলচ্চিত্রটি ফোলেৎস বায়ো কোম্পানি ১৭ এপ্রিল থিয়েটারে প্রদর্শনের পরিকল্পনা করেছে।
প্রযোজনা দায়িত্বে আছেন মার্তা ডাউলিয়ুতে এবং ব্রিনহিল্ডুর থোরারিন্সডটির, আর চিত্রগ্রহণের কাজটি সাইমন অ্যাভেরিন মার্কস্ট্রম পরিচালনা করেছেন। এডিটিং কাজটি অ্যানা এবর্ন সম্পন্ন করেছেন, যিনি চলচ্চিত্রের গতি ও কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। রুফিয়েরের মতে, এডিটরের কাজ ছাড়া চলচ্চিত্রের বর্ণনা এতটা সুনির্দিষ্ট এবং সংবেদনশীল হতে পারত না।
‘লা বেল আনয়ে’ তৈরির প্রক্রিয়া পাঁচ বছর ধরে চলেছে, যা রুফিয়েরের চলচ্চিত্র শিক্ষার সময় থেকেই শুরু হয়। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা চলচ্চিত্রে তুলে ধরা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণের একটি স্তর বজায় রাখতে পেরেছেন। স্ক্রিপ্টেড ও ইম্প্রোভাইজড দৃশ্যের সমন্বয় তাকে নিজের গল্পকে স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে।
চলচ্চিত্রের কিছু অংশে রুফিয়েরের প্রাক্তন শিক্ষিকার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা কিশোরবেলায় তার গোপন আকর্ষণের পুনরায় অনুসন্ধানকে সম্ভব করেছে। এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তিনি অতীতের স্মৃতিগুলোকে বর্তমানের চলচ্চিত্রিক ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন। যদিও ব্যক্তিগত দিকটি প্রকাশ করা সহজ কাজ নয়, রুফিয়েরের মতে, চলচ্চিত্রের কাঠামো তাকে নিরাপদে তার অভ্যন্তরীণ অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করতে সহায়তা করেছে।
প্রকল্পের পুরো সময়কালে রুফিয়েরের দলকে তিনি এক ধরনের পরিবার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কঠিন মুহূর্তে সহযোগীদের সমর্থন ও এডিটরের সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি চলচ্চিত্রকে সমন্বিত রূপে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। এই পারিবারিক পরিবেশই শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের আবেগময় গভীরতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে।
‘লা বেল আনয়ে’ রটারড্যাম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক দর্শকরা রুফিয়েরের আত্মবিশ্লেষণমূলক কাজকে প্রশংসা করার সম্ভাবনা রয়েছে। চলচ্চিত্রটি কেবল রুফিয়েরের ব্যক্তিগত স্মৃতির পুনর্নির্মাণ নয়, বরং সমসাময়িক দর্শকদের নিজের অতীত ও বর্তমানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি সেতু হিসেবে কাজ করবে। এই ধরনের স্বতন্ত্র ও আন্তরিক চলচ্চিত্রের উপস্থিতি বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দেবে, এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি সৃষ্টিশীল কাজের জন্য পথ প্রশস্ত করবে।



