ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ সাব্বির ফয়েজ মঙ্গলবার এক গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন; তিনি থাইল্যান্ডে চিকিৎসা গ্রহণের অনুমতি চেয়ে আসা সাবেক একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। মোয়াজ্জেম, যিনি পূর্বে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করতেন, গুরুতর স্পাইনাল কর্ডের আঘাতের কারণে বিদেশে বিশেষায়িত চিকিৎসা নিতে চেয়েছিলেন।
মোয়াজ্জেমের পক্ষে দায়ের করা পিটিশনে তিনি উল্লেখ করেন যে তার মেরুদণ্ডে আঘাতের ফলে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড লিকেজ হয়েছে এবং স্থানীয় চিকিৎসা সুবিধা যথেষ্ট নয়। তিনি ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত একটি চিকিৎসা অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথা উল্লেখ করে দ্রুত থাইল্যান্ডে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
শুনানিতে মোয়াজ্জেমের আইনজীবী মো. রায়হান জোর দিয়ে বলেন যে তার বিরুদ্ধে আনা মামলাটি ষড়যন্ত্রমূলক এবং তিনি কোনো রাষ্ট্রবিরোধী বা আইন লঙ্ঘনকারী কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। রায়হান আরও জোর দিয়ে বলেন যে রোগীর স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা না করে অনুমতি না দিলে মৌলিক মানবিক অধিকার লঙ্ঘন হবে।
তবে জজের বেঞ্চ রায়হানের যুক্তি সত্ত্বেও আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে। সহকারী রিয়াজ হোসেন আদালতের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেন যে মোয়াজ্জেমের থাইল্যান্ডে ভ্রমণের অনুমতি প্রদান করা হয়নি। এই রায়ের সঙ্গে সঙ্গে মোয়াজ্জেমের চিকিৎসা পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে যায়।
মোয়াজ্জেমের রাজনৈতিক প্রোফাইলের পটভূমি জানলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু মোয়াজ্জেম হোসেনকে একান্ত সচিব (এপিএস) পদে নিয়োগ দেন, যা পরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
মোয়াজ্জেমের এপিএস পদে থাকা অবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার, তদবির ও টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে বিশাল সম্পদ সঞ্চয় করার অভিযোগ উঠে। এই অভিযোগের পর ২০২২ সালের ২১ এপ্রিল তাকে এপিএস পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগগুলোতে বলা হয় যে তিনি সরকারি চুক্তিগুলোতে অনিয়ম করে ব্যক্তিগত স্বার্থে কোটি কোটি টাকা অর্জন করেছেন।
অনুমতি প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে সঙ্গে মোয়াজ্জেমের আইনি লড়াই আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তার আইনজীবী দল দাবি করে যে এই মামলা এবং ভ্রমণ অনুমতির অস্বীকৃতি উভয়ই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে চালু করা হয়েছে। তারা আদালতকে পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানায় এবং ভবিষ্যতে চিকিৎসা সংক্রান্ত জরুরি অনুমতি প্রদানকে সহজতর করার প্রস্তাব দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন যে এই রায়টি সাময়িক সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ওপর চলমান তদন্তের একটি অংশ। মোয়াজ্জেমের মতো ব্যক্তিদের ওপর আইনগত চাপ বাড়লে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস পেতে পারে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য সতর্কতা সৃষ্টি হবে। এছাড়া, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি অনুমতি না দিলে রোগীর জীবনঝুঁকি বাড়তে পারে, যা জনমতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, উচ্চ পর্যায়ের আদালত এখনো এমন আবেদনগুলোতে সতর্কতা অবলম্বন করছে যেখানে স্বাস্থ্যগত জরুরি প্রয়োজনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা মিশে আছে। অনুমতি না দেওয়া একটি সতর্ক সংকেত হতে পারে যে ভবিষ্যতে অনুরূপ আবেদনগুলোতে আরও কঠোর মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে।
মোয়াজ্জেমের আইনজীবী দল রায়ের পর আপিলের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। আপিল প্রক্রিয়ায় তারা চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রমাণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের রেফারেন্স উপস্থাপন করতে চান। শেষ পর্যন্ত, এই মামলার ফলাফল দেশের আইনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার মধ্যে সমতা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে।



