পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাপানে মোট পর্যটক সংখ্যা ৪২.৭ মিলিয়ন পৌঁছায়, যা গত বছরের প্রায় ৩৭ মিলিয়ন রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। এই বৃদ্ধি মূলত দুর্বল ইয়েনের ফলে জাপানকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য সাশ্রয়ী গন্তব্যে রূপান্তরিত করার ফলাফল।
তবে একই সময়ে চীনের পর্যটক সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ডিসেম্বর মাসে চীনা পর্যটকের আগমন প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে প্রায় ৩.৩ লক্ষে নেমে আসে, যা পূর্ব বছরের সমমানের তুলনায় বড় পতন।
এই পতনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে টোকিওর প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকারিচি নভেম্বর মাসে তাইওয়ানের ওপর সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেওয়ার পর চীনের তীব্র কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়। চীন সরকার তার নাগরিকদের জাপানে ভ্রমণ এড়াতে নির্দেশ দেয়, যা পর্যটন প্রবাহে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
পরিবহন মন্ত্রীর মতে, চীনের পর্যটক সংখ্যা হ্রাস সত্ত্বেও অন্যান্য দেশ ও অঞ্চলের পর্যটকদের প্রবাহ যথেষ্ট ছিল, যা মোট সংখ্যা ৪০ মিলিয়নের উপরে নিয়ে এসেছে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, ফলে চীনের পতনকে সমন্বয় করা সম্ভব হয়েছে।
চীন এখনও জাপানের প্রধান পর্যটন বাজার হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে চীনা পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন, যা মোট বিদেশি পর্যটকের প্রায় এক চতুর্থাংশ গঠন করে। এই গোষ্ঠী তৃতীয় ত্রৈমাসিকে প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার সমমানের ব্যয় করেছে, যা দেশের পর্যটন আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিবহন মন্ত্রীর উল্লেখে, ৪০ মিলিয়নের বেশি পর্যটককে আকর্ষণ করা একটি “গুরুতর সাফল্য” হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, চীনের পর্যটক সংখ্যা হ্রাসের পরেও ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত পর্যটকের প্রবাহে তীব্র বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা সামগ্রিক আয়কে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।
জাপান সরকার পর্যটন শিল্পকে শক্তিশালী করার জন্য বহু নীতি চালু করেছে। ফুজি পর্বত, ঐতিহাসিক মন্দির ও দূরবর্তী দ্বীপের সুশি রেস্টুরেন্টের মতো আকর্ষণীয় স্থানগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচার করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হল পর্যটকদের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদী ভ্রমণ প্রবণতা গড়ে তোলা।
দীর্ঘমেয়াদে, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক পর্যটক সংখ্যা ৬০ মিলিয়ন পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, ভিসা নীতি সহজীকরণ এবং স্থানীয় ব্যবসায়িক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়মূলক কাজের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, পর্যটন শিল্পের দ্রুত বৃদ্ধি জাপানের হোটেল, রিটেল এবং পরিবহন খাতে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে দুর্বল ইয়েনের কারণে বিদেশি পর্যটকরা জাপানের সেবা ও পণ্যে বেশি ব্যয় করতে সক্ষম হচ্ছে, যা স্থানীয় ব্যবসার মুনাফা বাড়াচ্ছে।
তবে চীনের পর্যটক প্রবাহের অনিশ্চয়তা একটি ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে চীনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা পুনরায় কঠোর হতে পারে, যা মোট পর্যটন আয়কে প্রভাবিত করতে পারে। তাই জাপানকে বিকল্প বাজারের উপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রচার কৌশল বজায় রাখতে হবে।
প্রধান পর্যটন সংস্থা JTB এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, সামগ্রিক পর্যটন প্রবণতা ইতিবাচক হলেও, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিবেশ ও মুদ্রা পরিবর্তনের প্রভাবকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, চীনের পর্যটক সংখ্যা পুনরুদ্ধার এবং নতুন বাজারের সম্প্রসারণই ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হবে।



