উখিয়ার কোসসবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শিবিরে আজ প্রাতঃকালীন সময়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, যার ফলে প্রায় একশত পঞ্চাশটি শেল্টার সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েকজনের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। শিবিরের বাসিন্দারা আতঙ্কে পালিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
অগ্নি রাত ৩ টার কাছাকাছি প্যালংখালি ইউনিয়নের ক্যাম্প ১৬-এ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় দমকল বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডলার ট্রিপুরা জানান, আগুনটি শিবিরের ডি-৪ ব্লকে ব্র্যাক পরিচালিত একটি শিক্ষাকেন্দ্র থেকে শুরু হয়ে আশেপাশের শেল্টার ও শেডে দ্রুত ছড়িয়ে যায়।
দমকল ইউনিটগুলো সতর্কতা পাওয়ার পর ৩:২০ টায় ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং প্রায় চার ঘণ্টা পর, ৭:৩০ টায় অগ্নি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। তবে এই সময়ের মধ্যে শত শত শেল্টার আগুনে পুড়ে গিয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষতি হয়েছে।
ডলার ট্রিপুরা উল্লেখ করেন, মোট ৪০০ থেকে ৫০০টি শেল্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৫০টি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে। ঘটনায় চার থেকে পাঁচজনের ক্ষুদ্র আঘাতের রিপোর্ট পাওয়া গেছে, তবে কোনো গুরুতর মৃত্যু রেকর্ড করা যায়নি।
প্রাথমিক তথ্য অনুসারে, শিবিরের বাসিন্দাদের কথায় আগুনের সূত্র হতে পারে রান্নাঘরের চুলা থেকে উত্পন্ন ধোঁয়া বা গরম করা পাত্রের অপ্রত্যাশিত বিস্ফোরণ। তবে দমকল বিভাগ এখনও চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই অগ্নিকাণ্ডের পূর্বে শিবিরে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। গত ২৬ ডিসেম্বর ক্যাম্প ৪-এ একটি হাসপাতাল আগুনে ধ্বংস হয়, আর এক রাতে কুটুপালং নিবন্ধিত শিবিরে দশের বেশি শেল্টার জ্বলে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রোহিঙ্গা শিবিরে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নির্দেশ করে।
বঙ্গবন্ধু সরকার বর্তমানে প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য এই শিবিরগুলো পরিচালনা করছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো নিয়মিত শিবিরে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে আসছে। অগ্নিকাণ্ডের পর এই সংস্থাগুলো শিবিরে অগ্নি প্রতিরোধের জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও শিবিরে অগ্নি নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন নির্দেশিকা প্রণয়নের কথা জানিয়েছে। এতে শেল্টার নির্মাণে অগ্নি প্রতিরোধী উপকরণ ব্যবহার, রান্নাঘরের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত অগ্নি প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, রোহিঙ্গা শিবিরে ঘটমান অগ্নিকাণ্ডগুলোকে মানবিক সংকটের একটি দিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো শিবিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
শিবিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারী বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা শিবিরের ঘনবসতিপূর্ণ প্রকৃতি এবং অপ্রতুল অবকাঠামো অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তারা আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে শিবিরের পরিকল্পিত পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।
অগ্নিকাণ্ডের পর শিবিরে পুনর্নির্মাণ কাজ দ্রুততর করার জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একত্রে কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয় ও মৌলিক সামগ্রী সরবরাহের পাশাপাশি, ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর অগ্নি নিরাপত্তা মানদণ্ড প্রয়োগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এই ঘটনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিবিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার জরুরি প্রয়োজন আবারও স্পষ্ট হয়েছে, এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা শিবিরের বাসিন্দাদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



