বাংলাদেশের অনেক গৃহে ছোটবেলায়ই একটি সাধারণ আদেশ শোনা যায়: “ছেলেরা কান্না করে না”। শিশুরা যখন হাঁটতে হোঁচট খায় বা হাঁটুতে আঘাত পায়, তখনই এই বাক্যটি শোনায়। কখনো হালকা স্বরে, কখনো তীক্ষ্ণভাবে, প্রায়ই রসিকতার ছলে বলা হয় এবং প্রশ্ন করা হয় না। তবে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই এক বাক্য শিশুর আবেগ, জ্ঞান এবং সামাজিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের শিশু, কিশোর ও পারিবারিক সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, শারীরিক বৃদ্ধি ছাড়াও মানসিক, জ্ঞানীয় এবং সামাজিক বিকাশ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, যখন এই দিকগুলোতে ব্যাঘাত ঘটে, তখন অন্যগুলোও প্রভাবিত হয়।
মানসিক বিকাশের মূল ভিত্তি হল আবেগকে সঠিকভাবে চেনা এবং তার প্রতি উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া জানানো। শিশুকে দুঃখ, ভয়, আনন্দ ইত্যাদি অনুভূতি আলাদা করে বুঝতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকাশ করতে সক্ষম হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, দুঃখের সময় কান্না করা স্বাভাবিক, ব্যথা অনুভব করলে তাও তেমনই প্রকাশ করা উচিত।
যখন ছেলেদেরকে কান্না করা ‘মেয়েলি’ বা ‘দুর্বল’ বলা হয়, তখন তারা স্বাভাবিক আবেগ প্রকাশকে দমন করতে শিখে। এই দমন প্রক্রিয়া মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পায়। দমন করা অনুভূতি অদৃশ্য হয় না; তা গোপনে জমা হয় এবং সময়ের সাথে সাথে অমীমাংসিত চাপের রূপ নেয়।
স্নায়ুবিজ্ঞানিক গবেষণা দেখায়, মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণের পথগুলো ব্যবহার করে গড়ে ওঠে। যদি শিশুরা তাদের অনুভূতি প্রকাশে বাধা পায়, তবে মস্তিষ্কে সেসব পথের বিকাশ সীমিত থাকে, ফলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যকরভাবে আবেগ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই দমনের সবচেয়ে স্পষ্ট ফলাফল হল রাগের বৃদ্ধি। ড. আহমেদ তার ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণে লক্ষ্য করেছেন যে, শৈশবে আবেগ প্রকাশে বাধা পেয়েছে এমন ছেলেরা প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে রাগকে নিয়ন্ত্রণে সমস্যার সম্মুখীন হয়। তারা প্রায়ই অপ্রত্যাশিতভাবে ক্রোধ প্রকাশ করে, যা পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অতিরিক্তভাবে, দমিত আবেগের ফলে আত্মবিশ্বাসের অভাব, উদ্বেগ এবং ডিপ্রেশন মত মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ছোটবেলায় তাদের অনুভূতি স্বীকার করতে পারত না, তারা পরবর্তীতে স্ট্রেস মোকাবেলায় কম সক্ষম হয়।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য প্রথম ধাপ হল পরিবারে শিশুর আবেগ প্রকাশকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা। যখন কোনো শিশু কাঁদে, তখন তাকে সমর্থন ও বোঝাপড়া দিয়ে সাড়া দেওয়া উচিত, তার চেয়ে তাকে ‘বালক নয়’ বলে দমন করা নয়। পিতামাতা ও শিক্ষকরা শিশুর অনুভূতি চিহ্নিত করতে সাহায্য করে, যেমন “তুমি কি দুঃখিত?” বা “তোমার কি কোনো কষ্ট হচ্ছে?” এমন প্রশ্নের মাধ্যমে সংলাপ গড়ে তোলা যায়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও আবেগ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। শিক্ষার্থীদেরকে তাদের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দেওয়া, গ্রুপ আলোচনা ও মানসিক স্বাস্থ্য কর্মশালার মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা সম্ভব। এভাবে ভবিষ্যতে তারা নিজের ও অন্যের অনুভূতি বুঝতে এবং সম্মানজনকভাবে আচরণ করতে শিখবে।
ড. আহমেদ উল্লেখ করেন, মানসিক বিকাশের সঠিক দিকনির্দেশনা শিশুর সামগ্রিক উন্নয়নে সহায়তা করে। শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি আবেগীয় প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দিলে, শিশুরা আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহানুভূতি এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় দক্ষতা অর্জন করবে।
সারসংক্ষেপে, “ছেলেরা কান্না করে না” এমন প্রচলিত ধারণা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। পরিবার ও সমাজের উচিত এই ধারণা থেকে সরে এসে শিশুর স্বাভাবিক আবেগ প্রকাশকে স্বাগত জানানো। এভাবে ভবিষ্যতে মানসিক রোগের ঝুঁকি কমে এবং সুস্থ মানসিকতা গড়ে ওঠে।
আপনার সন্তান বা পরিচিত কোনো শিশুর ক্ষেত্রে যদি আবেগ প্রকাশে বাধা দেখা যায়, তবে তৎক্ষণাৎ পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণের কথা ভাবুন। ছোটবেলায় সঠিক সমর্থন ও দিকনির্দেশনা দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও সমন্বিত বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে।



