ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলায় ১ আগস্ট ২০২২-এ রায়হান কবির ও জিয়ারুল হকের মেজো কন্যার বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পরপরই রায়হান দাবি করেন, বাসরঘরে দেখা কনে তিনি পূর্বে দেখানো মেয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি ‘কনে বদল’ ঘটেছে বলে অভিযোগ তুলে আদালতে মামলা দায়ের করেন।
বিবাহের আগে রায়হান ও তার পরিবার পীরগঞ্জের চন্ডিপুরে মৃত ইব্রাহীমের পুত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কনে দেখেন। মধ্যস্থতাকারী মোতালেবের কথায় রায়হানকে একটি মেয়ে দেখানো হয়, যার ছবি ও বর্ণনা দিয়ে বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তবে রায়হান জানান, অতিরিক্ত মেকআপ ও সাজসজ্জার কারণে বিয়ের রাতে কনে সঠিকভাবে চেনা যায়নি।
বিবাহের পরপরই রায়হান লক্ষ্য করেন, কনে মুখ ধোয়ার সময় তার মুখের রূপান্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং তিনি বুঝতে পারেন, তার সঙ্গে বিয়ে করা মেয়ে পূর্বে দেখানো মেয়ে নয়। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি কনে বদল ঘটেছে বলে দাবি করে, কনের বাবা জিয়ারুল হককে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেন।
কনের বাবা জিয়ারুল হক এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার তিন কন্যার মধ্যে বড় কন্যারই বিয়ে হয়েছে এবং মেজো কন্যা ছেলেদের বাড়িতে এসে কনেকে দেখেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিয়েতে প্রায় সত্তরজন বরযাত্রী উপস্থিত ছিলেন, তাই কনে বদলের কোনো সুযোগ ছিল না। জিয়ারুল হক অতিরিক্তভাবে জানান, বিয়ের পরদিনই ছেলেপক্ষ থেকে দশ লাখ টাকা যৌতুকের দাবি করা হয়, যা তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।
বিবাহের কয়েক ঘণ্টা পরই রায়হান ও তার পরিবার কনে বদল অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় নেতাদের ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেন, তবে কোনো সমাধান না পাওয়ায় আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২৭ আগস্ট রায়হানের মামা বাদল রায়হানের জন্য কনের বাবা জিয়ারুল হক ও ঘটক মোতালেবকে অভিযুক্ত করে ঠাকুরগাঁও আদালতে মামলা দায়ের করেন।
এরপর ২ সেপ্টেম্বর রায়হান একই আদালতে কনের বাবা জিয়ারুল হক ও ঘটক মোতালেবের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দায়ের করেন, যেখানে তিনি কনে বদল ও জালিয়াতি করার অভিযোগ তুলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের দাবি করেন। উভয় পক্ষের মামলায় আদালত একাধিক শুনানি পরিচালনা করে, তবে এখনো চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়নি।
মঙ্গলবার (১৯ জানুয়ারি) আদালত রায়হানের জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। জমানত প্রত্যাখ্যানের পেছনে আদালত উল্লেখ করেছে, রায়হানের অভিযোগের গুরুতরতা ও সম্ভাব্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে আটক রাখা প্রয়োজন। রায়হানকে রাত্রিকালীন জেলখানায় রাখা হয়েছে।
রায়হানের মামা বাদল মিডিয়াকে জানান, ঘটক মোতালেবের মাধ্যমে রায়হানের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে রাণীশংকৈলের শিবদিঘী এলাকায় একটি চায়ের দোকানে মোতালেব একটি মেয়ে দেখান এবং মেয়েটি পছন্দ হলে তা জানাতে বলা হয়। পরে মেয়েটি ছেলেপক্ষের বাড়িতে এসে, নতুন করে মেয়ে না দেখিয়ে দ্রুত বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়।
বিবাহের রাতে অতিরিক্ত মেকআপের কারণে কনের চেহারা পরিবর্তিত হওয়ায় রায়হান প্রথমে তা বুঝতে পারেননি। তবে বাসরঘরে কনে মুখ ধোয়ার পর তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন, তার সঙ্গে বিয়ে করা মেয়ে পূর্বে দেখানো মেয়ে নয়। রায়হান দাবি করেন, পরিকল্পিতভাবে কনে বদল করা হয়েছে এবং ২ আগস্ট কনেকে তার বাবার বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়।
কনের বাবা জিয়ারুল হক পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, কনে বদল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি উল্লেখ করেন, কনের বড় বোনের বিয়ে হয়েছে এবং মেজো কন্যা ছেলেদের বাড়িতে এসে কনেকে দেখেছেন। তাছাড়া, বিয়ের পরপরই ছেলেপক্ষ থেকে দশ লাখ টাকা যৌতুকের দাবি করা হয়, যা তিনি অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করেন।
আদালতের বর্তমান পর্যায়ে উভয় পক্ষের মামলার শুনানি অব্যাহত রয়েছে। রায়হানের জামিন প্রত্যাখ্যানের পর তার আইনজীবী আপিলের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন, তবে এখন পর্যন্ত কোনো আপিল দাখিলের তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, কনের বাবা জিয়ারুল হকও রায়হানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় তার নিজস্ব রক্ষা পরিকল্পনা প্রস্তুত করছেন।
এই মামলায় স্থানীয় সমাজে বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কনে বদল সংক্রান্ত অভিযোগের ফলে দুই পরিবারই আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে এবং বিবাহের আনন্দের পরিবর্তে আদালতের জটিলতা দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে আদালত কী রায় দেবে, তা এখনও অনিশ্চিত, তবে উভয় পক্ষই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।



