১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দেশটি ধ্বংসাবশেষে ঢাকা ছিল; অবকাঠামো ধ্বংস, শিল্পক্ষেত্র অচল এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেয়েছিল। এই কঠিন সময়ে তেলবাজারের উত্থান গালফ দেশগুলোর শ্রমিকের চাহিদা বাড়িয়ে দিল, যা বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রথম ঢেউকে সূচনা করে। প্রাথমিকভাবে টাকা পাঠানোর পদ্ধতি ছিল অনানুষ্ঠানিক—বন্ধু, আত্মীয় বা ভ্রমণকারীর মাধ্যমে, পোস্টাল মানি অর্ডার এবং হুন্ডি নেটওয়ার্কের সহায়তায়।
প্রথম দশকে রেমিট্যান্সকে প্রধানত পরিবারের জীবিকা রক্ষার উপায় হিসেবে দেখা হতো, তবে ১৯৮০ ও ৯০ দশকে বিশ্বায়নের ত্বরান্বিত হওয়ায় শ্রমিকের গতি দেশের রপ্তানি কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। সময়ের সাথে সাথে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং তা কেবল গৃহস্থালির সহায়তা নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের একটি স্তম্ভে রূপান্তরিত হয়। ফলে মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতির কিছু অংশে পুনরুজ্জীবন দেখা যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ জিডিপি বৃদ্ধিতে, আর্থিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এবং রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং যুবকরা একসাথে অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে। তবু উন্নয়নের গতি অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনও মাঝারি, যেখানে একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দেশগুলো উচ্চতর উন্নয়ন স্তরে পৌঁছেছে।
এই প্রেক্ষাপটে রেমিট্যান্সের তৃতীয় পর্যায়—রেমিট্যান্স ৩.০—প্রযুক্তি-চালিত পদ্ধতি হিসেবে উত্থান লাভ করেছে। ডিজিটাল পেমেন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত, নিরাপদ এবং স্বচ্ছ লেনদেন সম্ভব হচ্ছে। এই মডেলটি রেমিট্যান্সের খরচ কমিয়ে, প্রেরক ও প্রাপক উভয়ের জন্য সুবিধা বাড়িয়ে দেয়।
ফিনটেক সমাধানগুলো ইতিমধ্যে দেশের কিছু ব্যাংক ও ফিনটেক স্টার্টআপের মাধ্যমে প্রয়োগে রয়েছে; তবে সম্পূর্ণ রূপে গ্রহণের জন্য নীতিগত সমর্থন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। সরকার যদি রেমিট্যান্স ৩.০কে জাতীয় কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করে, তবে বিদেশি মুদ্রার প্রবাহ বাড়বে, ঋণ পরিশোধের চাপ হ্রাস পাবে এবং গ্রামীণ ও নগর উভয় স্তরে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অতীতের রেমিট্যান্স ১.০ থেকে বর্তমানের ডিজিটাল মডেল পর্যন্ত যাত্রা দেখায় যে, শ্রমিকের আয় দেশের অর্থনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন সময় এসেছে এই সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করার, যাতে রেমিট্যান্স কেবল পরিবারিক সহায়তা নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, রেমিট্যান্সের ডিজিটালাইজেশন কেবল লেনদেনের গতি বাড়াবে না, বরং মুদ্রা সঞ্চয়ের গুণগত মানও উন্নত করবে। স্বচ্ছতা বাড়লে অবৈধ চ্যানেল কমে যাবে এবং সরকারী নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তহবিল ব্যবহার সম্ভব হবে।
তবে এই রূপান্তরের পথে কিছু ঝুঁকি রয়েছে। প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অপ্রতুলতা, সাইবার নিরাপত্তা সমস্যা এবং গ্রামীণ অঞ্চলে ডিজিটাল সেবার সীমিত প্রবেশযোগ্যতা বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারকে সমন্বিত নীতি, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি প্রোগ্রাম চালু করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, ফিনটেকের মাধ্যমে রেমিট্যান্সের আধুনিকীকরণ বাংলাদেশকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, মুদ্রা স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির নতুন দিগন্তে নিয়ে যাবে। সঠিক নীতি ও প্রযুক্তিগত সমর্থন থাকলে রেমিট্যান্স ৩.০ দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, রেমিট্যান্সের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং বর্তমান ফিনটেক প্রবণতা একসাথে বিবেচনা করে, দেশের আর্থিক নীতি নির্ধারকদের জন্য রেমিট্যান্সকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে সংহত করা জরুরি। এভাবে রেমিট্যান্সের পূর্ণ সম্ভাবনা ব্যবহার করে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।



