২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলতে থাকায়, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের নেতারা রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টোকে তীব্র দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করছেন। মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট, ক্রেডিটের কঠোরতা এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা হ্রাসের ফলে শিল্পখাত ও কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্যবসা সংস্থাগুলি উচ্চস্বরে প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বছরের পর বছর চলমান মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ঘাটতি ব্যবসার লাভজনকতা কমিয়ে দিয়েছে, আর ঋণদানের শর্ত কঠোর হওয়ায় নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের ইচ্ছা হ্রাস পেয়েছে। ফলে উৎপাদন ও রপ্তানির পরিমাণে ধীরগতি দেখা গেছে, যা কর্মসংস্থানের সুযোগকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। এই আর্থিক চাপে ব্যবসা সংস্থাগুলি এখন কেবল শাব্দিক স্লোগান নয়, বাস্তবিক নীতি পরিবর্তনের দাবি করছে।
বাণিজ্যিক গোষ্ঠী বলছে, নির্বাচনের সময়কালে প্রচারিত জনসাধারণের উঁচু স্লোগান ও পপুলিস্টিক প্রতিশ্রুতি তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। তারা চান এমন নীতি যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে পুনরুজ্জীবিত করবে। তাই ম্যানিফেস্টোতে স্পষ্ট, সময়সীমা নির্ধারিত সংস্কার পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
ব্যবসা ক্ষেত্রের শীর্ষ অগ্রাধিকার হল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা। অনিশ্চয়তা কেবল রাজনৈতিক অস্বস্তি নয়, তা সরাসরি অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়ায়। নীতি পরিবর্তনের অপ্রত্যাশিততা বিনিয়োগের পরিকল্পনা বিলম্বিত করে, ঝুঁকি গ্রহণের ইচ্ছা কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই ব্যবসা নেতারা শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা, আইনের শাসন এবং নীতি ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি চাচ্ছেন।
দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবসা খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা হল ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো। বর্তমান সময়ে লজিস্টিক খরচ মোট দেশীয় উৎপাদনের ১৫-২০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিশ্ব গড়ের দ্বিগুণের কাছাকাছি। এই উচ্চ খরচ রপ্তানির প্রতিযোগিতা হ্রাস করে, দেশীয় পণ্যের দাম বাড়ায় এবং শিল্পের বৈচিত্র্যকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই ম্যানিফেস্টোতে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, সময়সীমা নির্ধারিত লজিস্টিক সংস্কারও অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
বন্দর কার্যকারিতা, জাহাজের গন্তব্যস্থল জ্যাম কমানো এবং কাস্টমস প্রক্রিয়ার আধুনিকীকরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বর্তমান বন্দর ব্যবস্থাপনা ও কাস্টমসের ধীরগতি রপ্তানি-আমদানি চক্রকে দীর্ঘায়িত করে, যা ব্যবসার খরচ বাড়ায়। ম্যানিফেস্টোতে নির্দিষ্ট সময়সীমা সহ বন্দর আধুনিকীকরণ, কাস্টমসের স্বয়ংক্রিয়তা এবং জাহাজের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা উল্লেখ করা উচিত।
পরিবহন খাতে রেলপথ ও অভ্যন্তরীণ জলপথের সম্প্রসারণ, বহুমুখী সংযোগের শক্তিশালীকরণ এবং মাল্টিমোডাল লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গঠনকে আরেকটি অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রেল ও নদী পথে পণ্য পরিবহনের খরচ কমলে, সরবরাহ শৃঙ্খল দ্রুত হবে এবং রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম হ্রাস পাবে। এই ধরনের অবকাঠামোগত সংস্কার না হলে লজিস্টিক ব্যয় উচ্চই থাকবে।
কাস্টমস পরিষেবার ২৪ ঘণ্টা চালু করা এবং বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনকে বাধ্যতামূলক করা দরকার। বর্তমান সময়ে কাস্টমসের ম্যানুয়াল কাজ ও সীমিত সময়ে পরিষেবা প্রদান ব্যবসার জন্য বড় বাধা। ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে ডকুমেন্টের স্বয়ংক্রিয় যাচাই ও অনুমোদন সম্ভব হবে, যা সময় ও খরচ উভয়ই কমাবে। এই রূপান্তর না হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতামূলকতা হ্রাস পাবে।
ব্যবসা পরিচালনার সহজতাকে বাড়াতে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সরলীকরণ, নিয়মাবলীর পুনর্গঠন এবং বিচারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে বহু সংস্থা জটিল লাইসেন্সিং, একাধিক নিয়মের অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি এবং বিচারের স্বেচ্ছাচারী ব্যবহারের সম্মুখীন। এসব বাধা নতুন উদ্যোগের সূচনা বিলম্বিত করে এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে বাধ্য করে। তাই ম্যানিফেস্টোতে স্পষ্টভাবে এই বাধাগুলোর সমাধান ও নিয়মের একীকরণ উল্লেখ করা প্রত্যাশিত।
সারসংক্ষেপে, ব্যবসা খাতের প্রধান প্রত্যাশা হল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতি ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবিক অর্থনৈতিক সংস্কার। যদি নির্বাচনের পর এই চাহিদাগুলো পূরণ হয়, তবে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। অন্যথায়, অনিশ্চয়তা ও উচ্চ খরচের চক্র অব্যাহত থাকবে, যা দেশের উন্নয়ন লক্ষ্যের পথে বাধা সৃষ্টি করবে।



