গোলশান পুলিশ প্লাজার এমসিআইসি অফিসে সোমবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মনসুর ব্যাংকিং খাতের বর্তমান তারল্য পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান নগদ ও বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয় পর্যাপ্ত থাকলেও, ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে এবং শুধুমাত্র ক্রেডিটযোগ্য গ্রাহকদের ওপর মনোযোগ দিতে হবে।
গভর্নর জানান, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের সময় ব্যাংকের তারল্য অবস্থা ইতিমধ্যে দুর্বল ছিল, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে চাপের মুখে। তবুও, সরকার এই অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ কোটি টাকা ঋণ নিতে সক্ষম হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন, যা আর্থিক নীতি সমর্থনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
ডিপোজিটের ক্ষেত্রে, গত ডিসেম্বরে ব্যাংকের আমানত ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও পূর্বাভাসে ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি আশা করা হয়েছিল। এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও, গভর্নর আশাবাদী যে, ঋণগ্রহীতাদের ক্রেডিটযোগ্যতা বাড়লে সুদের হার কমে যাবে; তিনি অনুমান করেন, ভালো গ্রাহকদের জন্য সুদ হার প্রায় দুই শতাংশ কমে যেতে পারে।
সেমিনারের শিরোনাম “ইকোনমির পালস বুঝতে পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স” ছিল এবং এটি এমসিআইসি ও পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশ যৌথভাবে আয়োজন করেছিল। অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক নীতি, বাজারের প্রবণতা এবং ব্যাংকিং সেক্টরের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
গভর্নর আরও জানান, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ার ফলে, আমদানি প্রবৃদ্ধি গত ডিসেম্বরে ছয় শতাংশে পৌঁছেছে। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্বে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে যে কঠিন সময় ছিল, তা অতিক্রম করে এখন আরামদায়ক অবস্থায় পৌঁছেছি। এই উন্নতি ঋণদানের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলবে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
সেমিনারে যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনের উপরাষ্ট্রদূত জেমস গোল্ডম্যানও উপস্থিত ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে ইচ্ছুক এবং দু’দেশের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার ভাগাভাগি সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধরনের আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য নতুন তহবিলের উৎস এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অনুষ্ঠানে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ এবং এমসিআইসির সভাপতি কামরান টি. রহমানও মতামত প্রকাশ করেন। উভয়ই ব্যাংকিং খাতের তরলতা, ঋণ নীতি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
বিশ্লেষকরা এই মন্তব্যকে ব্যাংকগুলোর ঋণদানের কৌশলে পরিবর্তনের সূচক হিসেবে দেখছেন। বর্তমান তারল্য অবস্থায়, ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি কমাতে এবং রিটার্ন বাড়াতে ক্রেডিটযোগ্য গ্রাহকদের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। সুদের হারে সম্ভাব্য হ্রাস ঋণগ্রহীতাদের জন্য আর্থিক ব্যয় কমাবে, যা বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয়ের উত্সাহ দিতে পারে। তবে, ঋণগ্রহীতাদের সীমিত করা মানে কিছু সেক্টরে ক্রেডিটের ঘাটতি হতে পারে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, গভর্নরের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ব্যাংকগুলোকে তরলতা বজায় রেখে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। সরকারী ঋণ গ্রহণের ক্ষমতা এবং রিজার্ভের উন্নতি আর্থিক বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তবে ঋণদানের মানদণ্ড কঠোর হলে ক্রেডিটের গুণগত মান বাড়বে। আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের প্রসারও ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য নতুন পুঁজি ও প্রযুক্তি প্রবাহের সম্ভাবনা তৈরি করবে।
সারসংক্ষেপে, বর্তমান তারল্য পরিস্থিতি এবং সরকারী ঋণ গ্রহণের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোকে ক্রেডিটযোগ্য গ্রাহকদের দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য করবে, যা সুদের হারে হ্রাস এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করে। একই সঙ্গে, ঋণ নীতিতে কঠোরতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।



