বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর আহসান এইচ. মানসুর আজ সন্ধ্যায় ঢাকা শহরের মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (MCCI) অফিসে অনুষ্ঠিত “পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (PMI) মাধ্যমে অর্থনীতির ধারা বোঝা” শিরোনামের সেমিনারে বর্তমান আর্থিক বছরের জন্য $৩৫ বিলিয়ন বিদেশি মুদ্রা রিজার্ভের লক্ষ্য পূরণ বা অতিক্রমের সম্ভাবনা নিয়ে দৃঢ় আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই রিজার্ভ স্তরটি দেশের জন্য যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) থেকে কোনো তহবিল আসলেও তা অতিরিক্ত সুবিধা হবে, অপরিহার্য নয়।
গবর্নর বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ম্যাক্রোইকোনমিক সংহতি প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে এবং ব্যালান্স অব পেমেন্টস ও রিজার্ভের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। এই উন্নয়নগুলো দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রপ্তানি খাতে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের হ্রাসের ফলে বাণিজ্যিক শর্তে উন্নতি ঘটেছে। আমদানি পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে মোট পেমেন্ট মাত্র ৫-৬ শতাংশ বাড়েছে, যা তেল দামের প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাসের ফলে সম্ভব হয়েছে। ফলে দেশের বহিরাগত অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমদানি টনেজ এবং কন্টেইনার ট্রাফিক উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই প্রবণতা দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পুনরুজ্জীবনকে নির্দেশ করে এবং রপ্তানি-আমদানি ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক।
বাংলাদেশ ব্যাংক উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি সূচকগুলোকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে; দৈনিক মুদ্রা বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রা রেমিট্যান্স প্রবাহ, সুদের হার এবং রিজার্ভের স্তর এসবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এসব সূচক নিয়মিত বিশ্লেষণ করে নীতি নির্ধারণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
গবর্নর নতুনভাবে প্রবর্তিত PMI-কে দেশের অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার একটি “স্বাগত সংযোজন” হিসেবে উল্লেখ করেন। PMI-এর মাধ্যমে উৎপাদন ও সেবা খাতের কার্যক্রমের ত্বরিত চিত্র পাওয়া যাবে, যা নীতি নির্ধারণে সময়োপযোগী তথ্য সরবরাহ করবে।
অভ্যন্তরীণ তরলতার দিক থেকে, ডিসেম্বর ২০২২-এ ৬.৪ শতাংশের ডিপোজিট বৃদ্ধি ডিসেম্বর ২০২৩-এ ১১ শতাংশে পৌঁছেছে। মোট জমা এখন টাকার ২০ ট্রিলিয়ন অতিক্রম করেছে, যা প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন টাকার অতিরিক্ত তরলতা যোগ করেছে। এই প্রবৃদ্ধি ব্যাংকের ঋণদান ক্ষমতা বাড়িয়ে দেশের অর্থনৈতিক গতি ত্বরান্বিত করবে।
রিজার্ভ লক্ষ্য অর্জনের জন্য IMF-র তহবিলের ওপর নির্ভর না করার সিদ্ধান্ত দেশের আর্থিক স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করবে। তহবিলের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে মুদ্রা নীতি আরও নমনীয়ভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে, যা বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য ইতিবাচক সংকেত।
তবে রপ্তানি খাতের কাঠামোগত সমস্যাগুলো, বিশেষ করে গ্লোবাল চাহিদার পরিবর্তন এবং পণ্যের প্রতিযোগিতা, রিজার্ভ লক্ষ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তদুপরি, তেল ও গ্যাসের দামের অস্থিরতা, বৈশ্বিক মুদ্রা বাজারের ওঠানামা ইত্যাদি ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না।
এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উৎপাদন দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিক চুক্তি শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে, মুদ্রা বাজারের স্বচ্ছতা ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা দরকার।
সারসংক্ষেপে, গবর্নরের আত্মবিশ্বাসের পেছনে দৃঢ় ম্যাক্রোইকোনমিক ভিত্তি, উন্নত বাণিজ্যিক শর্ত এবং নতুন পর্যবেক্ষণ সরঞ্জামের সমন্বয় রয়েছে। IMF-র অতিরিক্ত তহবিল না থাকলেও $৩৫ বিলিয়ন রিজার্ভ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



