প্রধান উপদেষ্টা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই মাসে জাতির ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা হিসেবে গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে ব্যাপক সংস্কার আনা হয়েছে এবং এই সংস্কারগুলোকে আরও গভীর ও বিস্তৃত করতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। সনদটি বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সম্মতি দরকার, তাই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত একটি সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে, তিনি যুক্তি দেন। এছাড়া, ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করবে, ফলে সংবিধান পরিবর্তনের জন্য একতরফা ক্ষমতা ব্যবহার করা যাবে না।
প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, নতুন সনদে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথমত, সরকার ও বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদের গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতিরা নির্বাচিত হবেন, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয় বাড়াবে। দ্বিতীয়ত, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দশ বছর পর্যন্তই প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন, যা ক্ষমতার দীর্ঘায়ু রোধ করবে। তৃতীয়ত, বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং রাষ্ট্রপতি অপরাধীকে ইচ্ছামতো ক্ষমা করতে পারবেন না।
সনদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ব্যবস্থা, সংসদে একটি উচ্চকক্ষের গঠন, এবং মৌলিক মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ধারা রয়েছে। এছাড়া, রাষ্ট্রভাষা বাংলা ছাড়াও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষা সংবিধানিক স্বীকৃতি পাবে, যা বহুভাষিক সমাজের অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে।
প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, নতুন সনদে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য একাধিক প্রক্রিয়া স্থাপন করা হয়েছে, যাতে একক ব্যক্তির হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হয়। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের শাসনব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
অধ্যাপক ইউনূসও গণভোটে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র গঠন করতে পারবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে এবং প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব হল নিজের এবং পরিচিতদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে এই সুযোগটি ব্যবহার করা।
প্রতিপক্ষের কিছু রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকরা সনদের কিছু ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, বিশেষ করে উচ্চকক্ষের গঠন এবং ভাষা স্বীকৃতি সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে নিয়ে তারা অতিরিক্ত জটিলতা ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো দল স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান প্রকাশ করেনি।
গণভোটের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক দিগন্তে নতুন মোড় আনতে পারে। যদি ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হয়, তবে সনদের ধারাগুলো আইনগতভাবে কার্যকর হবে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। অন্যদিকে, ‘না’ ভোটের ফলাফল সনদের প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোকে পুনর্বিবেচনা বা সংশোধনের দরকারি করে তুলবে।
গণভোটের সময়সূচি ও ভোটদান প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশন নির্ধারণ করেছে। ভোটারদেরকে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে গোপনীয়ভাবে তাদের পছন্দ প্রকাশ করতে হবে। ভোটের ফলাফল গণনা শেষে জাতীয় টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
এই গণভোটের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হবে এবং জনগণকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে। সকল নাগরিককে আহ্বান জানানো হচ্ছে, যেন তারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হতে পারে।



