ডেনমার্কের সশস্ত্র বাহিনী ১৯ জানুয়ারি গ্রিনল্যান্ডের কাংগারলুসুয়াক শহরে বড় যুদ্ধজাহাজ ও বিশাল সংখ্যক সৈন্য পাঠিয়ে স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে তুলেছে। এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের ইঙ্গিতের পর নেওয়া হয়েছে। ডেনমার্কের এই দ্রুত পদক্ষেপকে দ্বীপের নিরাপত্তা শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও ডেনিশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রকাশনা অনুযায়ী, বৃহৎ আকারের একটি যুদ্ধজাহাজ এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লড়াকু সৈন্য সোমবার সন্ধ্যায় কাংগারলুসুয়াকের তীরে পৌঁছাবে। সেনাবাহিনীর এই দলটি আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করে ত্বরিতভাবে মোতায়েন করা হয়েছে।
ডেনমার্ক ইতিমধ্যে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক-এ প্রায় একশো সৈন্য স্থাপন করেছে এবং একই সংখ্যক সৈন্য কাংগারলুসুয়াক অঞ্চলেও অবস্থান করছে। এই সৈন্যবাহিনী ‘আর্কটিক এনডুরেন্স’ নামে পরিচিত সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে কাজ করবে, যা পূর্বনির্ধারিত সময়ের চেয়ে আগে শুরু করা হয়েছে।
মহড়াটির পরিধি বাড়িয়ে আনা হয়েছে এবং এতে নতুন প্রশিক্ষণ মডিউল যুক্ত করা হয়েছে, যা আর্কটিক পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদী অপারেশন সক্ষমতা বাড়াবে। ডেনিশ কর্তৃপক্ষের মতে, এই প্রশিক্ষণটি দ্বীপের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ডকে ‘সম্পূর্ণ এবং নিরঙ্কুশ’ভাবে কিনে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং হোয়াইট হাউস থেকে এমন ইঙ্গিতও এসেছে যে, প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হতে পারে। তার এই মন্তব্যগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে আর্কটিকের কৌশলগত অবস্থান ও সম্পদ বিবেচনায়।
ডেনমার্ক সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রির কোনো পরিকল্পনা নেই এবং এটি ডেনিশ রাজতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রয়ে যাবে। ডেনিশ সরকার ট্রাম্পের মন্তব্যকে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছে।
ট্রাম্পের হুমকির পর আটটি ইউরোপীয় দেশ একত্রে যৌথ বিবৃতি জারি করে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের হুমকি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আর্কটিকের নিরাপত্তা ও ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতি তাদের অটল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এই সমন্বিত ইউরোপীয় অবস্থান ট্রাম্পের দাবিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিচ্ছিন্ন করেছে।
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান ও বিশাল খনিজ সম্পদ দীর্ঘদিন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে। তবে ডেনমার্কের দৃঢ় অবস্থান এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া এই দ্বীপের ভবিষ্যৎ বিক্রয় বা দখলকে কঠিন করে তুলেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে আর্কটিককে কেন্দ্র করে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে। ডেনমার্কের অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন কেবল প্রশিক্ষণমূলক নয়, বরং ট্রাম্পের সম্ভাব্য আক্রমণাত্মক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি স্পষ্ট সংকেত।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তিত না হয় তবে আরও সামরিক পদক্ষেপ বা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হতে পারে। একই সঙ্গে ডেনমার্ক ও তার ইউরোপীয় অংশীদাররা আর্কটিকের নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়াতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ডেনমার্কের দ্রুত সেনা মোতায়েন এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে নতুন এক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এই পদক্ষেপগুলো আর্কটিকের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং ভবিষ্যতে কূটনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলবে।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন, ডেনমার্কের অতিরিক্ত সামরিক ব্যবস্থা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কীভাবে বিকশিত হবে তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে থাকবে।



