শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) সকালবেলা ঢাকার বনানী শেরাটন হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিক ও সম্পাদকদের সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমান দেশের শাসনভার গ্রহণের শর্তে জনগণের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে নির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা জানালেন। তিনি স্পষ্ট করে বললেন, যদি দলটি সরকার গঠন করে তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানসহ মৌলিক বিষয়গুলোতে তৎক্ষণাৎ কার্যকরী নীতি চালু করা হবে।
রাজনীতি শুধুমাত্র সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যথেষ্ট নয়, এ কথায় তিনি জোর দিয়ে বলেন যে সংবিধান ও আইন সংস্কারের পাশাপাশি বাস্তবিক সমস্যার সমাধানই রাজনৈতিক দায়িত্বের মূল ভিত্তি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি পার্টির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ক্ষেত্রগুলোকে ছয়টি মূল শিরোনামে সংক্ষেপে উপস্থাপন করেন।
প্রথমত, নারীর ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সার্বজনীন ফ্যামিলি কার্ড চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় চুয়াল্লিশ মিলিয়ন পরিবারে নারীরা সরাসরি রাষ্ট্রের সহায়তা পাবে। দ্বিতীয়ত, কৃষকদের জন্য কৃষিকাজে সরাসরি যুক্ত প্রায় দশ মিলিয়ন জমি মালিককে লক্ষ্য করে একটি কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের উপর ভর্তুকি প্রদান করা হবে। তৃতীয়ত, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কল্যাণ, চতুর্থত, দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পঞ্চমত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সংস্কার—এই সব বিষয়কে তিনি সমন্বিতভাবে তুলে ধরেন।
তারেক রহমান জানান, ২২ জানুয়ারি থেকে দলটি তার সব পরিকল্পনা জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করবে। এই প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পার্টির নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছতা ও নাগরিক অংশগ্রহণের ভিত্তিতে গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
নারী স্বাবলম্বিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে তিনি উল্লেখ করেন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীদের জন্য আর্থিক সহায়তা সর্বজনীন করা হবে, যাতে দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারীকে বাদ না দিয়ে উন্নয়ন করা যায়। তিনি মার্টিন লুথার কিংয়ের স্বপ্নের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, বিএনপিরও একটি স্বপ্ন আছে—যেখানে নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা একসঙ্গে নিশ্চিত হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে নারীর শিক্ষার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা হয়েছিল, এখন তা আর্থিক মুক্তির দিকে অগ্রসর হবে।
কৃষক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি অতীতের বিএনপি সরকারের উদ্যোগের কথা স্মরণ করে বলেন, ভবিষ্যতে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য সার, বীজ ও যন্ত্রপাতিতে সরাসরি ভর্তুকি প্রদান করা হবে, যা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ব্যবস্থা কৃষকদের আর্থিক চাপ কমিয়ে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে তিনি প্রতিরোধমূলক নীতিকে গুরুত্ব দেন। “প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর”—এই নীতির ভিত্তিতে সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দরজায় পৌঁছে দিতে চায়, যাতে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করে চিকিৎসা করা যায়। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো একটি আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করে বলেন, তা দেশের সামগ্রিক কল্যাণে বড় ভূমিকা রাখবে।
শিক্ষা সংস্কার, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও প্রবাসী কল্যাণের বিষয়েও তিনি সংক্ষিপ্তভাবে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন, যদিও বিশদে এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এই নীতিগুলোকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
রহমানের মতে, যদি বিএনপি পরবর্তী নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট পায় এবং সরকার গঠন করে, তবে উপরে উল্লেখিত সব উদ্যোগ দ্রুত কার্যকর করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কেবল ভোটের জন্য নয়, বাস্তব নীতি বাস্তবায়নের জন্যও হওয়া উচিত।
প্রতিপক্ষ দল ও বিশ্লেষকরা এই ঘোষণাকে নজরে রাখছেন, কারণ সার্বজনীন ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ডের মতো বৃহৎ স্কেলের প্রকল্পের বাস্তবায়ন আর্থিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে চ্যালেঞ্জপূর্ণ হতে পারে। তারা পার্টির অতীত কর্মক্ষমতা ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এই পরিকল্পনার সামঞ্জস্যতা মূল্যায়ন করছেন।
বিএনপি দল আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু করে জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে বিস্তারিত নীতি পত্র প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে পার্টি তার পূর্ণাঙ্গ শাসন পরিকল্পনা জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করবে, যা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।



