ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী রুটে চলমান সব বাসে এখন থেকে ই‑টিকেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। সরকারি হোটেলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এই ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় এবং আগামী সাত দিনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে চালু করার পরিকল্পনা জানানো হয়েছে।
প্রধান অংশীদার হিসেবে ঢাকা মহানগর পুলিশ, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন এবং ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে ‘আর্বানমুভ টেক’ নামের একটি কোম্পানি, যা ই‑টিকেটিং সিস্টেমের নকশা ও পরিচালনা দায়িত্বে রয়েছে।
সম্মেলনে সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম ই‑টিকেটিং ব্যবস্থার মূল কাঠামো তুলে ধরেন। তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন রুটের পরিবহন সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে আরবানমুভ টেক পুরো সিস্টেমের তত্ত্বাবধান করবে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সেবা চালু হবে।
প্রয়োগের সময় ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন এবং পুলিশ প্রশাসন সমন্বিত তদারকি ও সমর্থন প্রদান করবে। এই সমন্বয় নিশ্চিত করবে যে সিস্টেমটি সুষ্ঠুভাবে কাজ করবে এবং কোনো ধরণের অনিয়ম না থাকে।
নতুন পদ্ধতির মূল নিয়মগুলো সংক্ষেপে বলা যায়: প্রথমত, সব বাস নির্ধারিত স্টপেজে থামবে এবং যাত্রীদের সেখানে ওঠা-নামা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যাত্রীরা অ্যাপ অথবা বিশেষ ডিভাইসের মাধ্যমে ই‑টিকেট সংগ্রহ করে গাড়িতে চড়তে পারবে। তৃতীয়ত, সরকার নির্ধারিত ভাড়া ছাড়িয়ে কোনো অতিরিক্ত ফি নেওয়া যাবে না, এবং ছাত্রদের জন্য ভাড়া অর্ধেক রাখা হবে, যা পূর্বের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাইফুল আলমের মতে, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে রাস্তায় যানজট কমবে, অনিয়মিত প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে এবং দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে। ফলে যাত্রীদের নিরাপত্তা, আরাম এবং সুবিধা বৃদ্ধি পাবে, পাশাপাশি গাড়ি চালকদের অবৈধ আয়ও বন্ধ হবে।
বিগত ১৬ বছর ধরে ঢাকা ও উপশহরের বাস পরিষেবা বিশৃঙ্খল অবস্থায় চলেছে। নির্দিষ্ট স্টপেজের অভাব, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, বৈধ রুট পারমিটের অনুপস্থিতি, চালকদের লাইসেন্স প্রাপ্তিতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং মাসিক/দৈনিক বেতন পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক কাজের পদ্ধতি ইত্যাদি সমস্যার ফলে সেবা মান কমে গেছে।
এই সমস্যাগুলো অনিয়মিত প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে, যেখানে কিছু চালক অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে লাভ করে, অন্যদিকে অধিকাংশ যাত্রী সঠিক সেবা পায় না। ই‑টিকেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে ভাড়া স্বচ্ছ হবে এবং কোনো অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা যাবে না।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে আরবানমুভ টেকের সমাধানটি ক্লাউড ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে রিয়েল‑টাইম টিকিট জেনারেশন, স্বয়ংক্রিয় ভাড়া হিসাব এবং ডেটা বিশ্লেষণ সক্ষম করে। এই ডেটা থেকে রুটের চাহিদা, পিক আওয়ার এবং যাত্রী প্রবাহের বিশদ তথ্য সংগ্রহ করা যাবে, যা ভবিষ্যতে রুট অপ্টিমাইজেশন ও সেবা উন্নয়নে কাজে লাগবে।
সিস্টেমের ব্যবহার সহজ করার জন্য মোবাইল অ্যাপের পাশাপাশি হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইসও সরবরাহ করা হবে, যা বাস চালক ও স্টপেজ কর্মীদের টিকিট যাচাই করতে সহায়তা করবে। যাত্রীরা অ্যাপের মাধ্যমে টিকিট কিনে সরাসরি QR কোড স্ক্যান করে গাড়িতে চড়তে পারবে, অথবা স্টপেজে থাকা টার্মিনাল থেকে টিকিট প্রিন্ট করেও ব্যবহার করতে পারবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা স্বীকার করা হলেও, সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা সমন্বিতভাবে সমস্যার সমাধান ও সিস্টেমের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে প্রস্তুত। এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো নেটওয়ার্কে ই‑টিকেট চালু হলে, ঢাকা শহরের পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হবে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রুট পরিকল্পনা, ভাড়া নির্ধারণ এবং সেবা মানের ওপর ডেটা‑চালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে, যা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শেষ পর্যন্ত, ই‑টিকেটিং সিস্টেমের সফল বাস্তবায়ন ঢাকা শহরের বাস সেবাকে আধুনিক, স্বচ্ছ এবং যাত্রী‑মুখী করে তুলবে।



