দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বয়লারের টিউব ফাটার ফলে আজ পর্যন্ত কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। রোববার বিকেলে শেষ ইউনিট বন্ধ হওয়ায় মোট ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার চারটি ইউনিটই স্থবির অবস্থায় রয়েছে। কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিকের মতে, ফাটলযুক্ত অংশের তাপমাত্রা এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা দ্রুত শীতল না করা পর্যন্ত মেরামত করা কঠিন।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট ক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট, যার মধ্যে দুটি ১২৫ মেগাওয়াটের ইউনিট এবং একটি ২৭৫ মেগাওয়াটের ইউনিট অন্তর্ভুক্ত। চারটি ইউনিটের মধ্যে দুই নম্বর ইউনিট ২০২০ সাল থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে এবং তখন থেকে এক ও তিন নম্বর ইউনিটই চালু ছিল। তবে তিন নম্বর ইউনিটও গত বছরের অক্টোবর মাসে ওভারহোলিং কাজের কারণে বন্ধ ছিল এবং পুনরায় চালু হতে দুই মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
রোববার বিকেলে এক নম্বর ইউনিটও বন্ধ হওয়ায় এখন কেন্দ্রের কোনো ইউনিটই বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না। বয়লারের টিউবের সংখ্যা হাজারেরও বেশি, এবং ফাটল একাধিক টিউবে হলে মেরামত প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে। সিদ্দিক উল্লেখ করেছেন, যদি মাত্র কয়েকটি টিউবের ফাটল হয় তবে পুনরায় চালু করা দ্রুত সম্ভব, তবে বিস্তৃত ক্ষতি হলে সময়সীমা বাড়বে।
গত বছর ১৯ অক্টোবরও একই কেন্দ্রের একটি ইউনিটে বয়লার পাইপ ফেটে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়েছিল। মেরামতের পর পুনরায় চালু করা হলেও একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল, যা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা নির্দেশ করে। এই ধারাবাহিক ব্যাঘাত কেন্দ্রের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রের সম্পূর্ণ বন্ধের ফলে উত্তরবঙ্গের বিদ্যুৎ সরবরাহে সরাসরি প্রভাব পড়বে। কেন্দ্রের ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, এবং এই পরিমাণের হঠাৎ ঘাটতি গ্রিডে লোড শেডিং বা অতিরিক্ত লোডের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিদ্যুৎ চাহিদা শীর্ষে থাকা শীতকাল এবং গ্রীষ্মের গরমের দিনে এই ঘাটতি বিশেষভাবে তীব্র হবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, বিদ্যুৎ ঘাটতি সরবরাহের দামের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিদ্যুৎ বাণিজ্যিক বাজারে ঘাটতি হলে রিটেল রেট বৃদ্ধি পেতে পারে, যা শিল্প ও গৃহস্থালী ভোক্তাদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ আরোপ করবে। এছাড়া, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এর জন্য অতিরিক্ত গ্যাস বা তেল ভিত্তিক বিকল্প কেন্দ্র চালু করতে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে, যা বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যর্থতা বিনিয়োগকারীর আস্থা কমাতে পারে এবং বিদ্যুৎ খাতে নতুন প্রকল্পের অর্থায়ন কঠিন করে তুলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত ও ব্যাপক রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা না থাকলে অনুরূপ ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে পারে। ফলে, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য অবকাঠামো আধুনিকায়ন, টিউবের গুণমান উন্নয়ন এবং দ্রুত মেরামত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
অবিলম্বে মেরামত কাজ শুরু করা হলে কেন্দ্রের উৎপাদন পুনরুদ্ধার হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে দুই মাসের মধ্যে হতে পারে, তবে টিউবের ক্ষতির পরিমাণ ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অবস্থা নির্ধারণের পরই সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত হবে। এই সময়ে BPDB বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পারে, তবে তা অতিরিক্ত ব্যয় এবং লোড শেডিংয়ের ঝুঁকি কমাতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বয়লার ফাটল দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা ও বাজারের স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। দ্রুত মেরামত, দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ কৌশল এবং আধুনিকীকরণ উদ্যোগই এই ধরনের ঝুঁকি কমাতে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে মূল চাবিকাঠি হবে।



