জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি, অফিসে দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসেরও কম সময়ে, শীঘ্রই নিম্নসভার (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) নির্বাচনের তারিখ জানাবেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। স্থানীয় মিডিয়ার সূত্রে জানা যায়, তিনি সোমবার বিকেলে একটি প্রেস কনফারেন্সে এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ করবেন। ভোটাররা এরপর ৪৬৫ সদস্যের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের আসন নির্বাচন করবে, যা জাপানের সবচেয়ে শক্তিশালী সংসদীয় শাখা।
তাকাইচি এবং তার মন্ত্রিসভা অক্টোবর থেকে উচ্চ জনসাধারণিক সমর্থন পেয়ে আসছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) বর্তমানে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ১৯৯টি আসন দখল করেছে, যার মধ্যে তিনটি স্বাধীন সহযোগীর কাছ থেকে। এটি কোনো একক দলের সর্বোচ্চ আসন সংখ্যা এবং জাপানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে তাদের প্রভাবকে দৃঢ় করে। এলডিপি-ইনোভেশন পার্টির সঙ্গে গঠিত জোটের মোট আসন সংখ্যা মাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট, ফলে নির্বাচনের ফলাফল জোটের স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে।
তাকাইচি শিনজো আবের প্রাক্তন সংরক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত এবং মার্গারেট থ্যাচারের প্রতি তার প্রশংসা তাকে “আয়রন লেডি” উপাধি দিয়েছে। তিনি জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ডিসেম্বর মাসে তার মন্ত্রিসভা নৌবাহিনীর জন্য রেকর্ড পরিমাণের প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করে, যা নয় ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ডলার) সমান। এই বাজেট চীনের সামরিক ক্রিয়াকলাপকে জাপানের “সর্বোচ্চ কৌশলগত চ্যালেঞ্জ” হিসেবে বিবেচনা করার পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত হয়েছে।
তাকাইচি গত নভেম্বর চীনের প্রতি কঠোর মন্তব্যের ফলে চীনের ক্রোধের মুখে পড়েন। তিনি টাইওয়ান আক্রমণ করলে জাপান নিজস্ব স্ব-রক্ষা বাহিনী দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন, যা দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে দশকের সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে দেয়। এই উত্তেজনা জাপানের নিরাপত্তা নীতি এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, তাকাইচি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। অক্টোবর মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাপান সফরের সময় দু’নেতা পারস্পরিক প্রশংসা করেন এবং বিরল ধাতু সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এছাড়া তারা একটি নথি স্বাক্ষর করে, যা “নতুন স্বর্ণযুগ” হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান সম্পর্কের ভবিষ্যৎকে চিহ্নিত করে। এই কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো জাপানের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়িয়ে তুলেছে।
অভ্যন্তরীণ নীতিতে তাকাইচি সরকারী ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পক্ষে। তিনি “আবেনোমিক্স” সময়ের মতো বড় পরিসরের উদ্দীপনা প্যাকেজের পুনরাবৃত্তি করতে ইচ্ছুক, যা জাপানের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হয়। তবে এই নীতির সমালোচকরা বাজেট ঘাটতি ও ঋণবৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করছেন।
প্রতিপক্ষ দলগুলো নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তারা যুক্তি দিচ্ছে যে এত দ্রুত নির্বাচনের আহ্বান করা ভোটারদের জন্য পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে রাজনৈতিক কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। এছাড়া, বিরোধী দলগুলো তাকাইচির চীনের প্রতি কঠোর অবস্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সমালোচনা করে, যা আঞ্চলিক শান্তি ও স্বায়ত্তশাসনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচনের ফলাফল জাপানের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে। যদি এলডিপি-ইনোভেশন জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকে, তবে তাকাইচি তার নীতি চালিয়ে যেতে পারবেন; অন্যথায়, বিরোধী দলগুলো সরকারে প্রভাব বাড়িয়ে নতুন নীতি দিকনির্দেশনা প্রস্তাব করতে পারবে। বিশেষত প্রতিরক্ষা বাজেট, চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক উদ্দীপনা বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়াবে।
সারসংক্ষেপে, শীঘ্রই ঘোষিত নিম্নসভার নির্বাচন জাপানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাকাইচির উচ্চ জনপ্রিয়তা, রেকর্ড প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে, তবে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধী দলের সমালোচনা তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। নির্বাচনের পরবর্তী ধাপগুলো জাপানের ভবিষ্যৎ কৌশলগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে।



