ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ-এ আজ গার্মেন্ট শিল্পের দুটি প্রধান সমিতি—বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BGMEA) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BKMEA)—একত্রে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে। উভয় সমিতি একসঙ্গে সরকারকে ইম্পোর্ট দ্যুটি বাতিলের সিদ্ধান্ত তৎক্ষণাৎ প্রত্যাহার করার দাবি জানায়, কারণ এই পদক্ষেপ গার্মেন্ট রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সম্মেলনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক চিঠির পর অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রেভিনিউ অথরিটি থেকে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সূক্ষ্মতা বিশিষ্ট ইয়ার্নের উপর দ্যুটি-মুক্ত বা বন্ড সুবিধা স্থগিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই পরিসরের ইয়ার্ন সাধারণত উচ্চ মানের পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এবং রপ্তানির মূল উপাদান হিসেবে গণ্য।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) বন্ড সুবিধা অনুযায়ী রপ্তানি-কেন্দ্রিক শিল্পগুলো কাঁচামাল দ্যুটি-মুক্তভাবে আমদানি করতে পারে, শর্ত থাকে যে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করা হবে। এই ব্যবস্থা গার্মেন্ট শিল্পের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
BGMEA-র কার্যনির্বাহী সভাপতি সেলিম রহমান এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যুক্তি তুলে বলেন, দ্যুটি-মুক্ত সুবিধা বাতিলের বদলে সরকার টেক্সটাইল মিলগুলোকে নগদ প্রণোদনা প্রদান করতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, সরাসরি আর্থিক সহায়তা শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা রক্ষা করতে এবং রপ্তানি প্রবাহ বজায় রাখতে কার্যকর হবে।
অধিকন্তু, সেলিম রহমান গ্যাস সরবরাহের অবকাঠামো উন্নত করার পরামর্শ দেন। বর্তমান গ্যাস ঘাটতি টেক্সটাইল মিলের উৎপাদন ক্ষমতা সীমিত করে, ফলে দ্যুটি-মুক্ত ইয়ার্নের সুবিধা নষ্ট হয়। গ্যাসের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত হলে মিলগুলো সম্পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা বাড়বে।
কর নীতি সংশ্লিষ্ট আরেকটি দিক হিসেবে তিনি রপ্তানি-কেন্দ্রিক গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর জন্য কর রিবেটের প্রস্তাব দেন। করের বোঝা হ্রাস পেলে উৎপাদন খরচ কমে, ফলে পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এছাড়া, ব্যাংক ঋণের সহজতর প্রবেশাধিকারও শিল্পের তরলতা বাড়াবে।
BKMEA-র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও একই দৃষ্টিকোণ থেকে মন্তব্য করেন যে, যেকোনো নীতি পরিবর্তন গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল উভয় ক্ষেত্রের স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণে গৃহীত হওয়া উচিত। তিনি জোর দেন, উভয় সেক্টরের স্বার্থ সমন্বয় না করলে রপ্তানি আয় হ্রাসের ঝুঁকি বাড়বে।
গার্মেন্ট রপ্তানিকারকরা সতর্ক করেন যে, দ্যুটি পুনরায় আরোপিত হলে কাঁচামালের খরচ বাড়বে, ফলে উৎপাদন খরচও বাড়বে। এই পরিস্থিতি রপ্তানি মূল্যের প্রতিযোগিতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্যের চাহিদা হ্রাস করতে পারে। বিশেষ করে, উচ্চ মানের নিটওয়্যার ও ওয়েভেন গার্মেন্টের বাজারে এই প্রভাব তীব্র হবে।
টেক্সটাইল সেক্টরের বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, দ্যুটি বাতিলের পরিবর্তে বন্ড সুবিধা বজায় রাখা শিল্পের আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে। একই সঙ্গে, সরকার যদি নগদ প্রণোদনা, গ্যাস সরবরাহের উন্নতি এবং কর রিবেটের মতো সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হবে।
সরকারের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে আলোচনার পর নতুন নীতি গঠন করা হতে পারে। যদি সরকার দ্যুটি-মুক্ত সুবিধা বজায় রাখে, তবে গার্মেন্ট শিল্পের রপ্তানি লক্ষ্য পূরণে সহায়তা পাবে। অন্যদিকে, দ্যুটি আরোপিত হলে শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং রপ্তানি আয় হ্রাস পেতে পারে।
সারসংক্ষেপে, গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল উভয় সেক্টরের প্রতিনিধিরা একত্রে সরকারকে দ্যুটি-মুক্ত বন্ড সুবিধা বজায় রাখতে এবং শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে সমন্বিত আর্থিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই দাবি যদি পূরণ হয়, তবে বাংলাদেশের গার্মেন্ট রপ্তানি বাজারের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে।



