ঢাকা – ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে দেশের ইন্টারিম সরকারের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে সমালোচনা করা হয়। একই মাসের ৮ তারিখে ড. বিরুপাক্ষা পল তার পূর্ববর্তী মন্তব্যের জবাবে একটি উত্তর প্রকাশ করেন। উভয় পক্ষই মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের সম্পর্ক বিশ্লেষণে ফিলিপস কার্ভের ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন।
প্রথম প্রবন্ধে লেখক ইন্টারিম সরকারের নীতি ব্যর্থতা সম্পর্কে সতর্কতা জানিয়ে, ঐতিহাসিক মডেলগুলোর সরাসরি প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশের প্রতিষ্ঠানগত কাঠামো ভাঙনের ফলে নীতি প্রেরণ প্রক্রিয়া যথাযথভাবে কাজ করছে না।
ড. পল ৮ জানুয়ারির উত্তরে ফিলিপস কার্ভ এবং তার প্রত্যাশা‑সংশোধিত রূপের প্রতি তার দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই মডেলটি এখনও তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্দিষ্ট শর্তে পুনরায় প্রমাণিত হতে পারে। তার যুক্তি হল, মডেলটি বাদ না দিয়ে বিশ্লেষণ করা উচিত।
লেখক জোর দিয়ে বলেন, তাদের বিতর্কের মূল বিষয় ফিলিপস কার্ভের অস্তিত্ব নয়, বরং তা বাংলাদেশের বর্তমান সংকটপূর্ণ পরিবেশে উপযুক্ত নির্ণয় সরঞ্জাম কি না, সেটাই। তিনি স্পষ্ট করেন, মডেলটি বাতিল করা বা তার ঐতিহাসিক মূল্য অস্বীকার করা তার উদ্দেশ্য নয়।
লেখক আরও উল্লেখ করেন, স্যামুয়েলসন, সোলো, ফ্রিডম্যান, লুকাস, প্লেস, আকারলফ, মানকিউ বা ক্রুগম্যানের মত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের তত্ত্ব উল্লেখ করলেও, তা বর্তমান পরিস্থিতি নির্ণয়ে যথেষ্ট নয়। প্রশ্নটি হল, এমন এক অর্থনীতিতে যেখানে নীতি প্রেরণ বাধাগ্রস্ত, ফিলিপস কার্ভ মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের প্রবণতা ব্যাখ্যা করতে পারে কি না।
ড. পল লেখকের প্রতি অভিযোগ তোলেন যে, তিনি ফিলিপস কার্ভকে “ধ্বংস” করে ইন্টারিম সরকারের সুনাম রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। এই অভিযোগে তিনি লেখকের উদ্দেশ্যকে রাজনৈতিক সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
লেখক এই অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তার সমালোচনা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, বরং নীতি ব্যর্থতার মূল কারণকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার আহ্বান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নীতির ফলাফলকে মূল্যায়ন করার আগে প্রয়োগের কাঠামোকে বিশ্লেষণ করা দরকার।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে সঠিক নির্ণয় ছাড়া পরিচিত তত্ত্বের ওপর নির্ভর করলে ভুল মূল্যায়ন হতে পারে। তাই, ইন্টারিম সরকারের কাজের প্রশংসা বা সমালোচনা উভয়ই বাস্তবিক সীমাবদ্ধতার সঠিক বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত।
ড. পলের যুক্তিতে মূল ত্রুটি হল তত্ত্বের অস্তিত্বকে কর্মক্ষমতা মাপার মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা। যদিও ফিলিপস কার্ভ তাত্ত্বিকভাবে বিদ্যমান, তা বর্তমান বাজারের অস্থিরতা ও নীতি প্রেরণের ব্যাঘাতে কার্যকর কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ।
আধুনিক ম্যাক্রোইকোনমিক্সে কাঠামোগত পরিবর্তন ও শককে স্বীকার করা হয়। নীতি প্রেরণের দুর্বলতা, আর্থিক বাজারের অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাতকে বিবেচনা না করে ঐতিহ্যবাহী মডেল প্রয়োগ করলে বিশ্লেষণ বিকৃত হতে পারে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পরিবেশকে কঠিন করে তুলছে। ক্রেডিটের খরচ বাড়ছে, আর বিদেশি মূলধনের প্রবাহে হ্রাস দেখা দিচ্ছে। এ ধরনের পরিবেশে পুরোনো মডেলকে একমাত্র নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন ডায়াগনস্টিক ফ্রেমওয়ার্কের প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা, নীতি প্রেরণের গতি এবং বাজারের প্রত্যাশাকে একত্রে বিবেচনা করা হলে অর্থনৈতিক প্রবণতা আরও সঠিকভাবে পূর্বাভাস করা সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারকদের জন্য মূল বার্তা হল, তাত্ত্বিক মডেলকে বাস্তবিক শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে ব্যবহার করা। না হলে, ভুল নির্ণয় থেকে ভুল নীতি গঠন হবে, যা বাজারের অস্থিরতা বাড়াবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
সারসংক্ষেপে, ফিলিপস কার্ভের তাত্ত্বিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না, তবে বাংলাদেশের বর্তমান সংকটময় পরিবেশে তার প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে সঠিক নির্ণয়, কাঠামোগত বাস্তবতা এবং নতুন মডেলের সংযোজনই ভবিষ্যৎ প্রবণতা নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হবে।



