রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাবুডাইং গ্রাম থেকে কোল জাতির পাঁচটি পরিবারকে গত বছর ২৭ অক্টোবর উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদের পর তারা গ্রামটির পার্শ্ববর্তী বাঁশের ঝাড়ে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। উচ্ছেদের কারণ ছিল জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ, যা আদালতে শেষ পর্যন্ত অস্বীকার করা হয়।
উচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গে সরকার থেকে কিছু টিনের ঘর দেওয়া হয়, তবে সেগুলো কেবল ছাপরা দেওয়ার মতোই ছিল। শীতের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়, কারণ টিনের ঘরগুলো শীতলতা ও বৃষ্টির বিরুদ্ধে যথেষ্ট সুরক্ষা দেয় না।
পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার সহায়তায় কিছু সাময়িক কাঠের কাঠামো তৈরি করা হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদী বাসস্থানের পরিবর্তে অস্থায়ী শরণস্থলই রয়ে যায়। ভূমিহীন অবস্থায় পরিবারগুলোকে মৌলিক জীবনের প্রয়োজন মেটাতে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে, যা তাদের দারিদ্র্যের চক্রকে আরও গভীর করে তুলেছে।
উচ্ছেদিত পরিবারগুলোর একজন রুমালী হাসদা জানান, তাদের পূর্বপুরুষ প্রায় ২৫ বছর ধরে ওই জমিতে বসবাস করছিল। পরিবারটি জানত না যে জমিটি খালি এবং তারা বিশ্বাস করত যে আত্মীয় তিলক মাঝি, দিনু মাঝি ও ভাদু মাঝির নামে জমির রেকর্ড রয়েছে। তবে স্থানীয় এক ব্যক্তি জমি রেজিস্টার করে নেন এবং পরে তার উত্তরাধিকারীরা আদালতে মামলা দায়ের করেন।
দারিদ্র্য ও সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে কোল পরিবারগুলোকে আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় তাদের পক্ষে না হয়ে, উচ্ছেদকে বৈধ বলে স্বীকার করা হয়। এই রায়ের ভিত্তিতে উচ্ছেদ কার্যকর করা হয়।
গোদাগাড়ী উপজেলার ইউনিটেড ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএনও) কর্মকর্তা মো. নাজমুস সাদাত আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় মানবিক দিক থেকে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, তবে তিনি পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো বিকল্প উল্লেখ করেননি।
উচ্ছেদের পর দেশজুড়ে সমালোচনা বাড়লেও উচ্ছেদিত পরিবারগুলোর জন্য কোনো স্থায়ী সমাধান এখনও দেখা যায়নি। ২০২২ সালের জাতীয় জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে কোল জাতির মোট জনসংখ্যা ৩,৮২২। এই সংখ্যা ছোট হলেও তাদের ভূমি সংকটের মাত্রা বৃহত্তর।
মধুপুরে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করা আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম উচ্ছেদের আতঙ্কে জীবন কাটাচ্ছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে বন ধ্বংসের মামলা ঝুলে আছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সমস্যার সমাধান না হলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকবে।
গোদাগাড়ীর কোলদের ঘটনা সমতল অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী ভূমি সংকটের একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমানের ২০২৪ সালে প্রকাশিত গবেষণা অনুসারে, সমতল অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ভূমিহীন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমানের সূচকে তারা সর্বদা পিছিয়ে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন যদিও ভূমি সুরক্ষার জন্য তৈরি, বাস্তবে তা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর হয়নি। আইনগত কাঠামোতে থাকা ফাঁকফাঁকি ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা এই গোষ্ঠীর অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ ভূমি কমিশনের গঠন প্রস্তাবিত হয়েছে, যাতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য স্বতন্ত্র ও ন্যায়সঙ্গত ভূমি বরাদ্দ নিশ্চিত করা যায়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারী পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়নি।
অপরাধমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, উচ্ছেদের পেছনে জমি রেজিস্ট্রেশন ও মালিকানা জালিয়াতি, দুর্নীতি ও দুর্বল আইনি সুরক্ষার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালু হওয়া সত্ত্বেও, এখন পর্যন্ত কোনো দায়িত্বশীলকে আইনি দায়ে টানা হয়নি। ভবিষ্যতে এই ধরনের উচ্ছেদ রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও তদারকি প্রয়োজন।



