লিউ থাই কের, সিঙ্গাপুরের পাবলিক হাউজিং নকশার প্রধান স্থপতি, গত রবিবার ৮৭ বছর বয়সে পরলোক গমন করেছেন। তিনি এক সপ্তাহ আগে পড়ে যাওয়ার পর জটিলতা বাড়ার ফলে মৃত্যুবরণ করেন, যা পরিবার থেকে জানানো হয়েছে। লিউর অবদান সিঙ্গাপুরের নগরদৃশ্যের প্রতিটি কোণায় স্পষ্ট, যেখানে হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (HDB) পরিচালিত ফ্ল্যাটগুলো শহরের আকাশচুম্বী কাঠামোকে গঠন করেছে।
লিউর কাজের ফলে সিঙ্গাপুরের ৫.৯ মিলিয়ন নাগরিকের অধিকাংশই একই ধরনের পাবলিক হাউজিংয়ে বাস করে। এই ফ্ল্যাটগুলোকে স্থানীয়ভাবে “এইচডিবি” বলা হয় এবং সরকারী সহায়তায় নির্মিত হওয়ায় নাগরিকদের জন্য তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। একবার ক্রয় করা হলে, সম্পত্তি মালিকের অধিকার ৯৯ বছর পর্যন্ত থাকে এবং নির্দিষ্ট সময় পর বাজারমূল্যে পুনর্বিক্রয় করা যায়।
অনেক দেশে পাবলিক হাউজিংকে ভাড়া বা সামাজিক সুবিধা হিসেবে দেখা হয়, তবে সিঙ্গাপুরের মডেলটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ফ্ল্যাটগুলোকে সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা নাগরিকদের আর্থিক সঞ্চয় ও সম্পদ গঠনে সহায়তা করে। যদিও কিছু সমালোচক যুক্তি দেন যে বাজারমূল্য নির্ধারণের অংশটি নিম্ন-আয়ের পরিবারকে বাদ দেয়, তবুও এই নীতি সিঙ্গাপুরের নেতৃত্বের জন্য জাতীয় সম্পদবণ্টনের মূল স্তম্ভ রয়ে গেছে।
লিউ থাই কের ১৯৩৮ সালে মালয়েশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ছয় বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে স্থানান্তরিত হন। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় স্থাপত্যশিল্পে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন, এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে সিটি প্ল্যানিং-এ মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা স্থপতি আই এম পেইয়ের নিউ ইয়র্ক অফিসে কাজ করেন, যা তাকে আধুনিক নগর নকশার গভীর জ্ঞান প্রদান করে।
১৯৬৯ সালে লিউ সিঙ্গাপুরে ফিরে এসে হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ডে যোগ দেন। শীঘ্রই তিনি প্রধান স্থপতি পদে উন্নীত হন এবং পরবর্তী দুই দশকে ২০টি নতুন টাউন পরিকল্পনা ও নির্মাণ তত্ত্বাবধান করেন। তার দায়িত্বে থাকা সময়ে সিঙ্গাপুরের বহু পুরনো স্লাম ধ্বংস হয়ে আধুনিক, সুসজ্জিত পাবলিক হাউজিংয়ে রূপান্তরিত হয়। এই রূপান্তর দেশের দ্রুত নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করে।
লিউর নেতৃত্বে নির্মিত টাউনগুলোতে সড়ক, পার্ক, স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করা হয়, যা বাসিন্দাদের জীবনমানকে ব্যাপকভাবে উন্নত করে। তার নকশা দর্শন ছিল “মানবমুখী নগরস্থান”—যেখানে প্রতিটি বাসিন্দা নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও সামাজিকভাবে সংযুক্ত পরিবেশে বসবাস করতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সিঙ্গাপুরের নগর পরিকল্পনা নীতিতে আজও প্রভাব ফেলছে।
লিউ থাই কেরের মৃত্যু সিঙ্গাপুরের নগর পরিকল্পনা ও হাউজিং ক্ষেত্রে একটি বড় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার কাজ কেবল ভবন নয়, বরং সিঙ্গাপুরীয়দের দৈনন্দিন জীবন, চলাচল ও পরিচয়ের গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সরকার ও সাধারণ মানুষ উভয়ই তার অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ নগর নকশার জন্য একটি মানদণ্ড হিসেবে রয়ে যাবে।
লিউর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে দেখা যায় যে, সঠিক পরিকল্পনা ও নীতি এক দেশের সামাজিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে পারে। সিঙ্গাপুরের বর্তমান হাউজিং মডেল তার দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবায়নের ফল, যা অন্য দেশের নগর উন্নয়নেও উদাহরণস্বরূপ ব্যবহৃত হয়। তার স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নগর পরিকল্পনার গুরুত্ব ও মানবিক দৃষ্টিকোণকে স্মরণ করিয়ে দেবে।
সারসংক্ষেপে, লিউ থাই কেরের মৃত্যু সিঙ্গাপুরের নগর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তার নকশা ও নীতি সিঙ্গাপুরের আধুনিক চিত্র গড়ে তুলেছে এবং দেশের নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও গর্বের বাসস্থান নিশ্চিত করেছে। ভবিষ্যতে তার শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি নতুন পরিকল্পনাকারী ও নীতিনির্ধারকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।



