কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একতরফা নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে একটি বিশাল বাণিজ্যিক চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। চুক্তির মূল ধারায় চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির উপর আরোপিত শুল্কের হার ১০০ শতাংশ থেকে ৬.১ শতাংশে নামিয়ে প্রথম ৪৯,০০০ গাড়ির জন্য শুল্ক হ্রাস করা হবে। এই শর্তের ভিত্তিতে পাঁচ বছরের মধ্যে কোটা ৭০,০০০ গাড়িতে বাড়ানোর সুযোগও সংরক্ষিত রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক প্রবাহকে আরও উন্মুক্ত করবে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই চুক্তিকে বাস্তববাদী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, বিশ্বযাত্রা অনুযায়ী কানাডা নিজেও অগ্রসর হবে। তিনি যুক্তি দেন যে ট্রাম্প শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের তুলনায় বর্তমানে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশি পূর্বাভাসযোগ্য ও স্থিতিশীল, ফলে অর্থনৈতিক নীতি গঠন সহজতর হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা এই চুক্তিকে কানাডার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য নীতিতে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন হিসেবে মূল্যায়ন করছেন। তারা উল্লেখ করেন, ২০২৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো কার্যকর বাণিজ্য চুক্তি না হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় কানাডা আগাম প্রস্তুতি হিসেবে চীনের সঙ্গে সমঝোতা করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প বাজারের ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
দেশের অভ্যন্তরে চুক্তির প্রতি প্রতিক্রিয়া মিশ্র। সাসকাচুয়ান প্রদেশের প্রধানমন্ত্রীর স্কট মো শুল্কের চাপ থেকে মুক্তি পাবে এমন কৃষকরা স্বস্তি পাবেন বলে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি বিশেষ করে কৃষি পণ্যের রপ্তানিতে শুল্ক হ্রাসের সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন, যা স্থানীয় কৃষকদের আয় বাড়াতে সহায়তা করবে।
অন্যদিকে অন্টারিও প্রদেশের প্রধানমন্ত্রীর ডগ ফোর্ড চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা প্রকাশ করেছেন। ফোর্ডের মতে, সস্তা চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি কানাডার স্বদেশীয় অটোমোবাইল শিল্পের জন্য বড় হুমকি তৈরি করবে এবং কর্মসংস্থান হ্রাসের ঝুঁকি বাড়াবে। তিনি স্থানীয় গাড়ি নির্মাতাদের প্রতিযোগিতামূলকতা রক্ষার জন্য রক্ষা নীতি প্রয়োজনীয় বলে জোর দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে চুক্তি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রেয়ার চুক্তিটিকে ‘সমস্যাজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন, যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন এবং কানাডার স্বার্থে সহায়ক বলে বিবেচনা করেছেন। এই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের জটিলতা প্রকাশ করে।
চুক্তির বাস্তবায়ন কানাডার ভোক্তাদের জন্য সরাসরি সুবিধা নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। শুল্ক হ্রাসের ফলে বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম কমে গুণগত মানের উন্নতি হবে, ফলে গ্রাহকরা কম মূল্যে আধুনিক গাড়ি কিনতে পারবেন। এছাড়া, পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের কার্বন নির্গমন কমাতে সহায়তা করবে।
তবে স্বদেশীয় উৎপাদন খাতের ওপর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। স্বল্পমেয়াদে চীনা গাড়ির প্রবেশ বাড়লে স্থানীয় গাড়ি নির্মাতাদের বাজার শেয়ার কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের প্রতিযোগিতামূলকতা ও কর্মসংস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে অটো পার্টস ও সমাবেশ লাইন কর্মীদের জন্য চাকরির নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে কানাডা কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তা এখনো অনিশ্চিত। চীন-সংশ্লিষ্ট চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি না থাকলে বিকল্প বাজার হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে তা দুই দেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে। উভয় দেশই ভবিষ্যতে শুল্ক নীতি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সরবরাহ শৃঙ্খল নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রাখে।
সারসংক্ষেপে, কানাডা চীনের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যা ভোক্তা সুবিধা এবং শিল্পের ঝুঁকির মধ্যে সমন্বয় চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে। নীতি নির্ধারক ও শিল্প প্রতিনিধিদের জন্য এখনই কৌশলগত সমন্বয় এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, যাতে স্বল্পমেয়াদী মূল্য সুবিধা দীর্ঘমেয়াদী শিল্প স্বাস্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।



