চীন জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রকাশনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৪০.৫ কোটি রেকর্ড করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩৩.৯ লাখের হ্রাস এবং ধারাবাহিক চতুর্থ বছর জনসংখ্যা কমার সূচক।
প্রতিবেদনটি জানায় যে ২০২৫ সালে জন্মের সংখ্যা ৭.৯২ লাখে নেমে এসেছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং প্রতি হাজারে জন্মহার ৫.৬৩ শতাংশে নেমে গেছে, যা ২০২৩ সালের ৬.৩৯ শতাংশের থেকেও কম।
এই জন্মহারের পতন চীনের দীর্ঘমেয়াদী জনমিতিক চ্যালেঞ্জের নতুন মাত্রা প্রকাশ করে, কারণ পূর্বে দেশের জন্মহার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল।
অন্যদিকে, একই সময়ে চীনের মোট দেশীয় উৎপাদন (জিডিপি) ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরকার নির্ধারিত বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে।
জনসংখ্যা হ্রাসের সঙ্গে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির এই বৈপরীত্য নীতি নির্ধারক এবং ব্যবসা বিশ্লেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে।
প্রথমত, শ্রমশক্তির সরবরাহে সংকোচন দেখা দিতে পারে; কর্মক্ষম বয়সের জনগোষ্ঠী কমে যাওয়ায় উৎপাদন খাতে শ্রমিক ঘাটতি বাড়তে পারে।
শ্রমিক ঘাটতি বিশেষ করে উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন কর্মী প্রয়োজনীয় উচ্চ প্রযুক্তি ও অটোমেশন শিল্পে তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ভোক্তা বাজারের গঠন পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; কম জন্মের ফলে ভবিষ্যতে যুবক গ্রাহক সংখ্যা হ্রাস পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমাতে পারে।
অন্যদিকে, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং বয়স্ক-নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, যা নতুন বাজার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
আবাসন বাজারেও প্রভাব পড়বে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন; তরুণ পরিবার কম হওয়ায় নতুন গৃহ নির্মাণের চাহিদা হ্রাস পেতে পারে, তবে বয়স্কদের জন্য রিটায়ারমেন্ট কমিউনিটি ও সেবা-ভিত্তিক হাউজিংয়ের চাহিদা বাড়তে পারে।
সরকারি আর্থিক নীতি এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে; কর সংগ্রহের ভিত্তি সংকুচিত হতে পারে, ফলে বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় নতুন রাজস্ব উৎস বা ব্যয় হ্রাসের প্রয়োজন হতে পারে।
পেনশন ব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের টেকসইতা প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ বয়স্কদের অনুপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেনশন পেমেন্টের চাপ বৃদ্ধি পাবে।
অঞ্চলীয়ভাবে, নগর ও গ্রামীণ জনসংখ্যার পার্থক্য আরও স্পষ্ট হতে পারে; বড় শহরে কর্মসংস্থান সুযোগের জন্য অভিবাসন কমে গেলে নগর উন্নয়ন প্রকল্পের গতি ধীর হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, সরকার সম্ভবত পরিবার নীতি পুনর্বিবেচনা, সন্তান জন্মে প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং কর্মজীবন-পরিবার সমন্বয় সহজতর করার পদক্ষেপ গ্রহণের দিকে মনোযোগ দিতে পারে।
বিনিয়োগকারীরা জনমিতিক প্রবণতা বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গড়ে তুলতে হবে; উদাহরণস্বরূপ, বয়স্ক-নির্দেশিত স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সেবা এবং রিটায়ারমেন্ট পণ্যগুলিতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন প্রভাব ফেলবে; শ্রম ব্যয় কমে যাওয়া উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে, তবে ভোক্তা বাজারের সংকোচন কিছু সেক্টরে ঝুঁকি বাড়াবে।
দীর্ঘমেয়াদে, জনসংখ্যা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং উদ্ভাবনী ব্যবসা মডেল গড়ে তোলা চীনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি হবে।
সারসংক্ষেপে, চীনের জনসংখ্যা ধারাবাহিক হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বজায় রাখা একটি জটিল সমন্বয় প্রয়োজন, যেখানে শ্রম সরবরাহ, ভোক্তা গঠন এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করে নীতি নির্ধারক, ব্যবসা নেতৃবৃন্দ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সঠিক সময়ে কৌশলগত সমন্বয় করা অপরিহার্য, যাতে ভবিষ্যৎ দশকে চীনের বাজারের স্থিতিশীলতা ও বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিশ্চিত করা যায়।



