করদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন আয়কর রিটার্ন দাখিল করে, তখন ডেপুটি কমিশনার অফ ট্যাক্সেস (ডিসিটি) রিটার্নের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের দায়িত্ব নেয়। তত্ত্বগতভাবে এই ধাপে অডিটেড আর্থিক বিবরণী, সমর্থনকারী নথি এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী করের পরিমাণ নির্ধারিত হওয়া উচিত। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া স্বেচ্ছাচারী রূপে কাজ করে, যা করদাতাদের জন্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং আইনগত কাঠামো আধুনিকায়নে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে করদাতাদের অভিজ্ঞতা দেখায় যে ন্যায়সঙ্গততা, পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং চূড়ান্ততা—যা একটি কার্যকর কর ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ—এই দুইটি ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে কর অডিটের পুনরাবৃত্তি এবং রিগ্রেসিভ পদ্ধতি এই সমস্যাকে তীব্রতর করে তুলেছে।
রিটার্ন দাখিলের পর ডিসিটি কর নির্ধারণের জন্য অডিটেড আর্থিক তথ্য, সমর্থনকারী নথি এবং প্রযোজ্য বিধি-নিয়মের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে। তবু প্রায়শই বিক্রয় সংখ্যা, যা স্বতন্ত্র অডিট রিপোর্টে সমর্থিত, কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই প্রত্যাখ্যান করা হয়। একই সঙ্গে, দৈনন্দিন ব্যবসায়িক ব্যয়গুলোকে ‘ডকুমেন্টেশন অপর্যাপ্ত’ বলে অস্বীকার করা হয়, যদিও সংশ্লিষ্ট নথি হিসাব ও অডিট মানদণ্ডে পূর্ণ।
এই ধরনের অনিয়মিত মূল্যায়নের ফলে করদাতাদের আপিলের সংখ্যা বাড়ে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের অডিটেড হিসাবের সঠিকতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকলেও, উচ্চতর আপিল স্তরে বিষয়টি নিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আপিল প্রক্রিয়া সময় ও আর্থিক সম্পদ উভয়ই গ্রাস করে, যা ব্যবসার মূল কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়।
অডিটের পরেও অনেক রিটার্ন একই কর জোনের অন্য সার্কেলের কর কর্মকর্তাদের দ্বারা পুনরায় নির্বাচিত হয়। নির্বাচনের মানদণ্ড স্পষ্ট না থাকায় করদাতারা কেন তাদের রিটার্ন পুনরায় পরীক্ষা করা হচ্ছে তা জানে না। এই দলগুলো পূর্বে করা মূল্যায়ন পুনরায় পর্যালোচনা করে, প্রায়শই করের পরিমাণ পরিবর্তন করে এবং পূর্বে সমাধান হওয়া বিষয়গুলো আবার উন্মোচন করে।
ন্যাশনাল বোর্ড অফ রেভিনিউ (এনবিআর) এর অধীনে দু’টি অতিরিক্ত শাখা—ইনস্পেকশন ডিপার্টমেন্ট এবং সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল—ও একই রিটার্নের উপর স্বাধীন অডিট চালায়। এই শাখাগুলো পূর্বে নির্ধারিত করের ওপর পুনরায় প্রশ্ন তুলতে পারে, ফলে করদাতাদের জন্য অনিশ্চয়তার পরিসর বাড়ে।
ব্যবসা সংস্থাগুলো এই ধারাবাহিক অডিট চক্রের ফলে নগদ প্রবাহে বাধা, পরিকল্পনা ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়তে দেখছে। বিশেষ করে রপ্তানি-নির্ভর ও উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত অডিটের খরচ সরাসরি মুনাফা হ্রাসের দিকে নিয়ে যায়। ফলে বাজারে বিনিয়োগের পরিবেশ শীতল হচ্ছে এবং নতুন প্রকল্পের সূচনা বিলম্বিত হচ্ছে।
কর প্রশাসনের জন্যও এই পুনরাবৃত্তি অডিটের ফলে সম্পদ বণ্টন অদক্ষ হয়ে পড়ে। উচ্চ ঝুঁকির ক্ষেত্রের ওপর নজর কমে যায়, যখন পুনরায় অডিটের জন্য অতিরিক্ত মানবসম্পদ ও সময় ব্যয় করা হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি কর সংগ্রহের কার্যকারিতা হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি করে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, যদি অডিটের স্বচ্ছতা এবং নির্বাচন মানদণ্ড স্পষ্ট না করা হয়, তবে করদাতাদের মধ্যে অবিশ্বাসের মাত্রা বাড়বে। এই অবিশ্বাসের ফলে স্বেচ্ছা কর প্রদান কমে যাবে এবং অনিয়মিত করদাতাদের সংখ্যা বাড়তে পারে। ফলে সরকারকে করভিত্তি সম্প্রসারণের লক্ষ্য অর্জনে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
ভবিষ্যতে কর ব্যবস্থার সংস্কার যদি পূর্বাভাসযোগ্যতা ও চূড়ান্ততা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে ব্যবসায়িক পরিবেশের প্রতিযোগিতামূলকতা হ্রাস পাবে। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কর নীতি ও অডিট প্রক্রিয়ার স্থিতিশীলতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়; তাই এই অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক মূলধনের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশে বর্তমান অডিট পদ্ধতি করদাতাদের জন্য অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করছে এবং কর প্রশাসনের কার্যকারিতা হ্রাস করছে। স্বচ্ছতা, স্পষ্ট মানদণ্ড এবং একবারের অডিটে চূড়ান্ততা নিশ্চিত করা হলে ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাস বাড়বে, কর সংগ্রহের দক্ষতা উন্নত হবে এবং বাজারে বিনিয়োগের প্রবাহ পুনরুজ্জীবিত হবে।



