কর বিভাগের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, যদি কোনো ট্যাক্সপেয়ার এই আর্থিক বছরের আয়কর রিটার্ন জমা না করেন, তবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সহ অন্যান্য সরকারি পরিষেবার সংযোগ কেটে দেওয়া সম্ভব। এই ব্যবস্থা সরাসরি আয়কর আইনের অধীনে কর কর্মকর্তাদের প্রদান করা হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের আয়কর নির্দেশিকায় মোট পাঁচটি প্রয়োগযোগ্য শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে; তার মধ্যে একটি হল পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, রিটার্ন না জমা দিলে এই শাস্তি কার্যকর করা হবে, যা পূর্বে কেবল আর্থিক জরিমানা বা সম্পত্তি জব্দের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ ছিল।
রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা দুইটি প্রধান গ্রুপের ট্যাক্স শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) এর ওপর আরোপিত। প্রথম গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হলেন, যাঁদের করযোগ্য আয় বছরে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি। দ্বিতীয় গ্রুপে রয়েছে সেইসব করদাতা, যাঁদের জন্য রিটার্ন দাখিল আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। উভয় ক্ষেত্রেই রিটার্ন না দিলে পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে।
বৈধভাবে সরকারি সেবা গ্রহণের জন্য মোট ৩৯টি বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে রিটার্নের প্রমাণ দেখাতে হবে। এতে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিকম, ট্যাক্সি লাইসেন্স, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। রিটার্ন না থাকলে এই সেবাগুলোর ব্যবহারকারীর অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করা হবে।
রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়সীমা ঐতিহ্যগতভাবে ১ জুলাই থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ছিল। তবে এই বছর দুই ধাপের সময় বাড়িয়ে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে সকল ট্যাক্সপেয়ারকে তাদের বার্ষিক আয়‑ব্যয়ের বিবরণী দাখিল করতে হবে।
২০২৩ থেকে সব ট্যাক্সদাতাকে অনলাইন পোর্টাল www.etaxnbr.gov.bd-তে রিটার্ন জমা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এই পোর্টালটি ন্যাশনাল বয়লার রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের অংশ হিসেবে কাজ করে এবং রিটার্নের স্বয়ংক্রিয় যাচাই প্রক্রিয়া চালু করেছে। তবে পাঁচটি বিশেষ শ্রেণীর করদাতাকে অনলাইন দাখিল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যেমন কৃষক, ছোট ব্যবসা ও নির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা গ্রুপ।
বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ টিআইএনধারী রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৩১ লাখ করদাতা ইতিমধ্যে রিটার্ন দাখিল করেছেন, যা মোট ট্যাক্সপেয়ারের প্রায় ২৭%। বাকি ট্যাক্সদাতাদের জন্য এখনই রিটার্ন দাখিল করা জরুরি, নতুবা পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্নের ঝুঁকি বাড়বে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পদক্ষেপের প্রভাব স্পষ্ট। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিলে ইউটিলিটি কোম্পানিগুলোর নগদ প্রবাহে হ্রাস ঘটতে পারে, পাশাপাশি গ্রাহক সন্তুষ্টি ও সেবার ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে, সরকারী আয় বাড়বে, কারণ রিটার্ন না দেওয়া করদাতারা এখন সেবা হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে, ফলে দেরি না করে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রবণতা বাড়বে।
ইউটিলিটি সেক্টরে রিটার্ন না জমা দেওয়া গ্রাহকদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা মানে সরাসরি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বাধা। শিল্পখাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ধারাবাহিক সরবরাহ অপরিহার্য; সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে উৎপাদন থেমে যাবে, ফলে কর্মসংস্থান ও আয় হ্রাস পাবে। তাই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো রিটার্ন দাখিলকে অগ্রাধিকার দেবে, যাতে সেবা অব্যাহত থাকে।
ডিজিটাল রূপান্তরের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করলে, ভবিষ্যতে রিটার্ন না দাখিলের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের মাধ্যমে ত্বরিত সংযোগ বিচ্ছিন্নের সম্ভাবনা বাড়বে। সরকার ইতিমধ্যে আইটি অবকাঠামো শক্তিশালী করেছে, যা রিয়েল‑টাইমে রিটার্নের অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় শাস্তি কার্যকর করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তিগত উন্নয়ন শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাড়াবে, তবে করদাতাদের জন্য ঝুঁকি বাড়াবে।
সংক্ষেপে, আয়কর রিটার্ন না দিলে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি মৌলিক সেবার সংযোগ কেটে দেওয়া এখন বাস্তবায়নযোগ্য শাস্তি। করদাতাদের জন্য সময়মতো রিটার্ন দাখিল করা আর্থিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে অপরিহার্য। সরকার এই নীতি ব্যবহার করে ট্যাক্স কনফরমিটি বাড়াতে এবং রাজস্ব সংগ্রহে স্থিতিশীলতা আনতে চায়। তাই সকল ট্যাক্সপেয়ারকে নির্দেশনা অনুসারে অনলাইন পোর্টালে রিটার্ন জমা দেওয়া এবং সংযোগ বিচ্ছিন্নের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।



