শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৪৫ হাজার কোটি টাকার মোট বাজেট নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি‑৫ (PEIDP‑5) চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা, অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং আগামী পাঁচ বছরে সকল শিশুকে মৌলিক সাক্ষরতা ও গণিতের দক্ষতা অর্জন করানো।
বাজেটের মধ্যে ৩০,০০০ কোটি টাকা সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল থেকে আসবে, আর বাকি ১৫,০০০ কোটি টাকা আন্তর্জাতিক ঋণ ও অনুদানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। এই অর্থের বড় অংশ বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), ইউনিসেফ, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (JICA), গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন (GPE), ইউনেসকো এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে।
কর্মসূচির কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে একটি সমন্বিত, ন্যায়সঙ্গত, টেকসই এবং উচ্চমানের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গঠন করা, যেখানে প্রতিটি শিশুকে মৌলিক সাক্ষরতা, গণিতের দক্ষতা এবং একুশ শতকের প্রয়োজনীয় দক্ষতা দিয়ে সজ্জিত করা হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষার ফলাফল, ভর্তি হার এবং উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নেট ভর্তি হার বর্তমানে ৯৪.৫৫ শতাংশ, যা ১০০ শতাংশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাক‑প্রাথমিক স্তরে সম্পূর্ণ ভর্তি নিশ্চিত করা, প্রাথমিক স্তরের নিট ভর্তি হার ১০০ শতাংশে উন্নীত করা এবং প্রায় দুই লক্ষ শিশুকে, যারা বর্তমানে স্কুলের বাইরে রয়েছে, আবার শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা এই কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য। এছাড়া সমাপনী হার ৮৪ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশের উপরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে।
শিক্ষা গুণগত মানের দিক থেকে, তৃতীয় শ্রেণিতে বাংলা বিষয়ের ৭০ শতাংশ এবং গণিতে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে দক্ষতা অর্জন করতে হবে; পঞ্চম শ্রেণিতে গণিতে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে নির্ধারিত মানে পৌঁছাতে হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য পাঠ্যক্রমের পুনর্বিন্যাস, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাসামগ্রী উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শিক্ষা উপস্থিতি ও ঝরে পড়ার হার কমানোর জন্যও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমান ১৬.২৫ শতাংশের ঝরে পড়ার হারকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা, এবং গড় উপস্থিতি হারকে ৮৭.৪৫ শতাংশ থেকে ৯৩ শতাংশে উন্নীত করা হবে। একক শিফট স্কুলে শিক্ষার সময়সীমা ২০ শতাংশ বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সময় বৃদ্ধি করা হবে, যা পূর্বে সীমিত সময়ে পরিচালিত ক্লাসের ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে।
PEIDP‑5 এর বাস্তবায়ন সময়সূচি PEIDP‑4 প্রকল্পের সমাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, এবং এরপর পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে চালু হবে। তবে প্রকল্পের দ্রুত গতি এবং বৃহৎ বাজেটের কারণে কিছু সমালোচনা উত্থাপিত হয়েছে। সমালোচকরা উল্লেখ করছেন যে, পূর্বের ধাপ সম্পন্ন না হওয়া সত্ত্বেও নতুন বড় প্রকল্পের সূচনা অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষত, অবকাঠামো নির্মাণে বেশি জোর দেওয়া হলে শিক্ষার গুণগত ফলাফল নিশ্চিত হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী শুধুমাত্র শারীরিক সুবিধা বাড়ানো নয়, শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ এবং শিক্ষক দক্ষতা উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দেওয়া দরকার, না হলে লক্ষ্যগুলো কাগজে-কলমে রয়ে যাবে।
বহিরাগত ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভরতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর আর্থিক বোঝা বাড়াতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি থেকে নেওয়া ঋণ প্রধানত দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের জন্য, তবে ঋণের শর্তাবলী এবং পরিশোধের সময়সূচি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ-অনুদান ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষা ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন যে, লক্ষ্য অর্জনের জন্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য। শুধুমাত্র বাজেট বরাদ্দই নয়, তদনুযায়ী কার্যকরী পরিকল্পনা এবং নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি ট্র্যাক করা দরকার।
মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা ও অডিটের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং তহবিলের ব্যবহার স্বচ্ছ রাখার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহে সমানভাবে তহবিল বরাদ্দ করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ: স্কুলে উপস্থিতি রেকর্ড নিয়মিত চেক করুন, বাড়িতে পাঠ্যপুস্তক ছাড়া অতিরিক্ত পাঠের ব্যবস্থা করুন এবং স্থানীয় শিক্ষাকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে শিক্ষার অগ্রগতি সম্পর্কে জানুন। এভাবে শিশুরা প্রোগ্রামের লক্ষ্য পূরণে সহায়তা পাবে এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবে।



