সপ্তাহের শেষের সন্ধ্যায় স্পেনের আন্ডালুসিয়া অঞ্চলের আদামুজ শহরের কাছাকাছি দুইটি উচ্চগতির ট্রেন সংঘর্ষে ধাক্কা খায়। এতে কমপক্ষে ২১ জনের প্রাণ ত্যাগ করে এবং বহু মানুষ আহত হয়। দুর্ঘটনাটি মালাগা থেকে মাদ্রিদে চলা একটি ট্রেনের ট্র্যাক থেকে বিচ্যুত হয়ে বিপরীত দিকের ট্রেনের পথে গিয়ে ঘটেছে। মাদ্রিদ থেকে হুয়েলভা দিকে চলা দ্বিতীয় ট্রেনটিও একই সময়ে ডেরেইল হয়।
আন্ডালুসিয়ান জরুরি সেবা জানায় যে অন্তত ২৫ জন গুরুতরভাবে আহত হয়েছে, আর বাকি আহতদের মধ্যে বেশিরভাগই হালকা আঘাতের শিকার। আহতদের মধ্যে বয়সের পরিসর বিস্তৃত, কিছু শিশু ও বয়স্ক নাগরিকও অন্তর্ভুক্ত। আহতদের তৎক্ষণাৎ নিকটস্থ হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।
দুর্ঘটনা ঘটার সময় ট্রেনটি মালাগা থেকে প্রস্থান করে প্রায় দশ মিনিট পরে, স্থানীয় সময় ১৮:৪০ (গ্রীনউইচ মান সময় ১৭:৪০) এ ট্র্যাক থেকে বেরিয়ে যায়। এই ঘটনার পর মাদ্রিদ ও আন্ডালুসিয়ার মধ্যে সমস্ত রেল পরিষেবা অবিলম্বে বন্ধ করা হয়। রেল নেটওয়ার্ক অপারেটর আদিফের মতে, এই রুটের যাতায়াত পুনরায় চালু হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
প্রাইভেট রেল কোম্পানি ইরিও, যেটি মালাগা-মাদ্রিদ রুট পরিচালনা করছিল, দুর্ঘটনা নিশ্চিত করে এবং জানায় যে ট্রেনে প্রায় ৩০০ যাত্রী ছিল। ইরিওর প্রতিনিধিরা জানান, দুর্ঘটনার পর সকল যাত্রীকে নিরাপদে স্থানান্তর করার জন্য জরুরি কর্মী ও রেল কর্মীরা একত্রে কাজ করেছে।
স্পেনের রাজা ফিলিপে ষষ্ঠ ও রাণী লেটিসিয়া এই দুঃখজনক ঘটনার প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রয়্যাল প্যালেসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মৃতদের পরিবারকে সমবেদনা জানানো এবং আহতদের দ্রুত সেরে ওঠার জন্য শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পেদ্রো সানচেজ সরকারকে জরুরি সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে শিকড় তদন্তে যুক্ত করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের দুর্ঘটনা রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নকে ত্বরান্বিত করবে।
আন্ডালুসিয়া অঞ্চলের গভার্নর জুয়ানমা মরেনোও শিকারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে, পরিবারগুলোর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি স্থানীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা প্রদান করতে বলার আহ্বান জানান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রেল নিরাপত্তা সংস্থা (ERA) ইতিমধ্যে এই ঘটনার পর্যালোচনা শুরু করেছে এবং স্পেনের রেল অবকাঠামোর সামগ্রিক নিরাপত্তা মান যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত তদন্তের ইঙ্গিত দিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের পরিবহন মন্ত্রীও উল্লেখ করেছেন, এই ধরনের বড় আকারের দুর্ঘটনা ইউরোপীয় রেল নেটওয়ার্কের সংহতি ও নিরাপত্তা নীতিমালার পুনর্বিবেচনা প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে পারে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “স্পেনের উচ্চগতির রেল সিস্টেম ইউরোপের অন্যতম উন্নত হলেও, এই ধরণের ডেরেইল ঘটনার পেছনে রক্ষণাবেক্ষণ, সিগন্যালিং এবং মানবিক ত্রুটি একসঙ্গে কাজ করতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন, “ইউরোপীয় রেল সংস্থা দ্রুত একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে ফলাফল প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।”
প্রাথমিক তদন্তে ট্র্যাকের ত্রুটি, ট্রেনের ব্রেক সিস্টেম এবং সিগন্যালিং ত্রুটি সহ বিভিন্ন সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষণ করা হবে। স্প্যানিশ সরকার ইতিমধ্যে রেল কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা প্রোটোকল আপডেটের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
এই দুর্ঘটনা স্পেনের রেল নেটওয়ার্কের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা কেবল দেশীয় নয়, ইউরোপীয় রেল সংযোগের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। রেল পরিবহনকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানদণ্ডের কঠোর প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্ট হয়েছে।



