দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিটের বয়লারের টিউব ফেটে যাওয়ার ফলে উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়েছে। টিউবের তাপমাত্রা প্রায় এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, এবং শীতল হওয়ার পরই মেরামত কাজ শুরু হবে বলে জানা গেছে।
কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী রোববার রাতে ঘটনার নিশ্চিতকরণ করেন এবং উল্লেখ করেন যে, টিউবের ক্ষতি এক সপ্তাহের মধ্যে মেরামত সম্পন্ন না হলে পুনরায় চালু করা সম্ভব না হতে পারে। এই সময়সীমা মেরামতের জটিলতা এবং বয়লারের শীতলকরণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে অনুমান করা হয়েছে।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট ক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট, যা তিনটি ইউনিটে বিভক্ত। প্রথম ইউনিটের ১২৫ মেগাওয়াটের উৎপাদন বন্ধ হওয়ায়, কেন্দ্রের মোট উৎপাদন শূন্যে নেমে এসেছে। অন্য দুটি ইউনিট ইতিমধ্যে বন্ধ ছিল; দ্বিতীয় ইউনিট ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে চালু হয়নি, আর তৃতীয় ইউনিট গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে।
তৃতীয় ইউনিটের পুনরায় চালু করার জন্য চীনা সরবরাহকারীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অপেক্ষা চলছে। সরবরাহ সম্পন্ন হলে, মার্চ মাসের মধ্যে এই ২৭৫ মেগাওয়াটের ইউনিট চালু হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে এই সময়সূচি সরবরাহের সময়সীমা এবং ইনস্টলেশন প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল।
কেন্দ্রের সম্পূর্ণ বন্ধের ফলে স্থানীয় বিদ্যুৎ বাজারে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিতে পারে। দিনাজপুর ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধি পেলে লোড শেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে। বিদ্যুৎ সংস্থাগুলো বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করতে বাধ্য হতে পারে, যা শেষ ব্যবহারকারীর বিলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বন্ধের আর্থিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। ইউনিটগুলো বন্ধ থাকায় উৎপাদন থেকে আয় বন্ধ হয়ে যাবে, এবং মেরামতের জন্য অতিরিক্ত খরচও যুক্ত হবে। তাছাড়া, দ্বিতীয় ইউনিটের পুনরায় চালু করার জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এখনও পাওয়া যায়নি, যা দীর্ঘমেয়াদে কেন্দ্রের আয় সম্ভাবনাকে সীমিত করবে।
চীনা যন্ত্রাংশের আগমনের অপেক্ষা করা তৃতীয় ইউনিটের পুনরায় চালু হওয়া দেশের তাপবিদ্যুৎ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে এই প্রক্রিয়ার সময়সীমা অনিশ্চিত থাকায়, বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে স্বল্পমেয়াদে গ্যাস টারবাইন বা হাইড্রোইলেকট্রিক প্রকল্পের ব্যবহার বাড়াতে হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বন্ধের ফলে দেশের মোট তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১% কমে যাবে। যদিও এই শতাংশ ছোট, তবে সরবরাহ সংকটের সময়ে এটি মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিদ্যুৎ দামের সাময়িক বৃদ্ধি সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে শিল্পখাতে যেখানে ধারাবাহিক শক্তি সরবরাহ অপরিহার্য।
সরকারি নীতি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পুনরায় চালু হওয়া না পর্যন্ত, স্বল্পমেয়াদে গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনই প্রধান বিকল্প হিসেবে রয়ে যাবে। এই পরিস্থিতি গ্যাসের দাম ও সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কেন্দ্রের মেরামত কাজের অগ্রগতি ও পুনরায় চালু হওয়ার সময়সূচি পর্যবেক্ষণ করা হবে। মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করে দ্রুত পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও আর্থিক ক্ষতি কমে।
সংক্ষেপে, বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের বন্ধ বিদ্যুৎ সরবরাহ, বাজার মূল্য এবং কেন্দ্রের আর্থিক স্বাস্থ্যের উপর বহুমুখী প্রভাব ফেলবে। তৃতীয় ইউনিটের মার্চ মাসে চালু হওয়া পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদে বিকল্প শক্তি উৎসের ব্যবহার বাড়াতে হবে, এবং দ্বিতীয় ইউনিটের পুনরায় চালু করার জন্য তহবিল নিশ্চিত করা জরুরি।
ভবিষ্যতে, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবকাঠামো আধুনিকায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতি দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ স্থিতিশীলতা ও খরচ কমাতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংযোজন বিদ্যুৎ বাজারের ঝুঁকি হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



