ভারতীয় শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের ধারাবাহিক প্রস্থান এবং রুপির অব্যাহত দুর্বলতা আর্থিক বাজারের সাম্প্রতিক প্রবণতা নির্ধারণ করেছে। ন্যাশনাল সিকিউরিটিজ ডিপোজিটরি লিমিটেডের (এনএসডিএল) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মোট ১ লাখ ৬৬ হাজার কোটি রুপি মূল্যের শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে সরে গেছেন।
২০২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই সপ্তাহের অর্ধেকেরও বেশি সময়ে অতিরিক্ত ২২,৫৩০ কোটি রুপি মূল্যের শেয়ার বিক্রি করা হয়েছে। এই পরিমাণের তুলনায় দেশীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা একই সময়ে ৩৪,০৭৬ কোটি রুপি মূল্যের নতুন মূলধন বাজারে প্রবেশ করিয়ে শূন্যস্থান পূরণে ভূমিকা রাখছেন।
বিদেশি মূলধনের প্রস্থান সত্ত্বেও দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাজারের অস্থিরতা কিছুটা শমিত করেছে। তবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকতে পারে যদি না নতুন নীতি প্রণোদনা বা কাঠামোগত পরিবর্তন আসে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি না হওয়া এবং ডলারের তুলনায় রুপির ধারাবাহিক অবমূল্যায়নই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাণিজ্যিক অমিলের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি ধারণা বাড়ে, ফলে তারা মূলধন প্রত্যাহার করে।
রুপির অবনতি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের উৎস। গত ডিসেম্বর মাসে রুপি ডলারের বিপরীতে ৯০ রুপির সীমা অতিক্রম করে, এবং জানুয়ারি মাসে ৯০.৮৯ রুপিতে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছায়, যা ঐতিহাসিক নিম্নমান। পূর্ববর্তী দিনটি ৯০.৮৭ রুপিতে রেকর্ড হয়। এই ধারাবাহিক দুর্বলতা মুদ্রার স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দেন, বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত জটিলতা এবং মুদ্রা নীতি সংশোধনের অভাব রুপির অবমূল্যায়নের মূল চালিকাশক্তি। ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী নীতি পরিবর্তন বা নতুন বাণিজ্যিক আলোচনার ফলাফল রুপির দামের গতি পরিবর্তনে প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষত ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে, বাজারের গতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক আশাবাদী। তারা প্রত্যাশা করেন, যদি বাণিজ্যিক বাধা হ্রাস পায় এবং মুদ্রা নীতি সমন্বয় করা হয়, তবে বিদেশি মূলধনের প্রবাহ পুনরায় বাড়তে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে ভারতের মতো উদীয়মান বাজারের সমৃদ্ধি সম্ভাবনা এখনও উজ্জ্বল। যদিও স্বল্পমেয়াদে বিদেশি বিনিয়োগের প্রত্যাহার বাজারের তরলতা কমিয়ে দেয়, তবু দেশীয় বিনিয়োগের দৃঢ়তা এবং জনসংখ্যার বৃহৎ ভোক্তা ভিত্তি ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারের পুনরুত্থানকে সমর্থন করবে।
বাজারের সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে, রুপি ও শেয়ারবাজারের পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্ট। মুদ্রার অবমূল্যায়ন শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের আকর্ষণ কমিয়ে দেয়, তবে একই সঙ্গে রপ্তানি-ভিত্তিক কোম্পানিগুলোর রপ্তানি আয় বাড়িয়ে শেয়ার মূল্যের কিছুটা সমর্থন করে।
সারসংক্ষেপে, বিদেশি মূলধনের প্রস্থান এবং রুপির দুর্বলতা বর্তমান আর্থিক পরিবেশের দুইটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। নীতি নির্ধারকদের দ্রুত বাণিজ্যিক বাধা দূর করা এবং মুদ্রা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে দেশীয় ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীই বাজারে আত্মবিশ্বাসীভাবে অংশ নিতে পারেন।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও সুযোগের দিক থেকে, বাজারের অংশগ্রহণকারীদের উচিত মুদ্রা নীতি, বাণিজ্যিক আলোচনার অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক মূলধন প্রবাহের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা। এই উপাদানগুলোই শেয়ারবাজারের পরবর্তী দিকনির্দেশনা নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হবে।



