জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আজ ঘোষণা করেছে যে, আমদানি পর্যায়ে প্রদত্ত অগ্রিম আয়কর (AIT) এখন থেকে সরাসরি করদাতাদের ই‑রিটার্নে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রেডিট হিসেবে প্রদর্শিত হবে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হল আমদানি ব্যবসায়িকদের দীর্ঘদিনের কর ক্রেডিট সংক্রান্ত সমস্যাকে দূর করা এবং রিফান্ড প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করা।
নতুন সিস্টেমটি ASYCUDA World সফটওয়্যারকে এনবিআরের ই‑রিটার্ন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত করে বাস্তব‑সময়ের তথ্য আদান‑প্রদান সম্ভব করেছে। একবার সংযুক্তির মাধ্যমে, কাস্টমস থেকে প্রাপ্ত বিল‑অফ‑এন্ট্রি তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট অগ্রিম করের পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ই‑রিটার্নে লোড হবে, ফলে ম্যানুয়াল যাচাইয়ের প্রয়োজন কমে যাবে।
করদাতা যখন ই‑রিটার্নে ব্যবসায়িক আয়ের বিবরণ দাখিল করবেন, তখন সংশ্লিষ্ট আর্থিক বছরের জন্য আমদানি থেকে পরিশোধিত অগ্রিম করের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ হবে। এই ক্রেডিটটি মোট আয়কর দায়ের বিরুদ্ধে সমন্বয় করা হবে এবং চূড়ান্ত পরিশোধযোগ্য করের পরিমাণ নির্ধারিত হবে।
এনবিআর উল্লেখ করেছে যে, এই স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে আমদানিকারক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর ক্রেডিটের স্বীকৃতি পেতে যে সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হতো, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে। পাশাপাশি, ম্যানুয়াল যাচাইয়ের ফলে সৃষ্ট ভুল ও বিরোধের সম্ভাবনা হ্রাস পাবে, যা সামগ্রিক কর সংগ্রহের দক্ষতা বাড়াবে।
বাংলাদেশে রিফান্ড প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে ধীর এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাতে হাতে সম্পন্ন হতে হয়েছে, যদিও আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রিফান্ড প্রদান বাধ্যতামূলক। নতুন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এই সমস্যার সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪৬ লক্ষের বেশি করদাতা ই‑রিটার্ন সিস্টেমে নিবন্ধিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩৩ লক্ষ ইতিমধ্যে তাদের রিটার্ন দাখিল করেছেন। বাধ্যতামূলক অনলাইন ফাইলিং না থাকা করদাতারাও এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করছেন, যা সিস্টেমের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশেষত, বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জন্যও এই সেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের জন্য প্রায় ৪,০০০ অ-নিবাসী করদাতা অনলাইনে রিটার্ন জমা দিয়েছেন, যা রেমিট্যান্স আয় ও বিদেশি বিনিয়োগের কর সংগ্রহে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে।
সিস্টেম চালুর পর, এনবিআর রিটার্ন দাখিলের শেষ তারিখ এক মাস বাড়িয়ে জানিয়েছে; এখন করদাতাদের রিটার্ন জমা দিতে হবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। এই সময়সীমা বাড়ানোটি নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসা ও বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, স্বয়ংক্রিয় কর ক্রেডিটের সংযোজন আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের গঠনকে প্রভাবিত করতে পারে। করদাতারা দ্রুত ক্রেডিট পেয়ে নগদ প্রবাহে উন্নতি পাবে, ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত ব্যয় কমে যাবে। একই সঙ্গে, রিফান্ডের সময়সীমা হ্রাস পেলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণদানের ঝুঁকি কমে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি ত্বরান্বিত করবে।
তবে, প্রযুক্তিগত সংহতকরণের সময় সিস্টেমের স্থায়িত্ব ও ডেটা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ত্রুটি বা ডেটা লিক হলে করদাতার আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে এবং রিফান্ড প্রক্রিয়ায় নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই, এনবিআরকে নিয়মিত সিস্টেম আপডেট ও সাইবার সিকিউরিটি ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, এই স্বয়ংক্রিয় মডেলটি অন্যান্য কর ধরণে সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে শুল্ক, ভ্যাট ও সেবা করের ক্ষেত্রেও একই রকম রিয়েল‑টাইম ডেটা শেয়ারিং করা যেতে পারে, যা সমগ্র কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে সহায়তা করবে।
সারসংক্ষেপে, এনবিআরের এই উদ্যোগ আমদানি‑পর্যায়ের অগ্রিম করকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ই‑রিটার্নে যুক্ত করে করদাতাদের জন্য প্রক্রিয়ার গতি বাড়াবে, ম্যানুয়াল ত্রুটি কমাবে এবং রিফান্ডের সময়সীমা হ্রাস করবে। সঠিক প্রযুক্তিগত সমর্থন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে, এটি বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে।



