লিবিয়ার নিরাপত্তা বিভাগ কুফ্রা শহরের একটি গোপন কারাগার থেকে দুই শতাধিক অভিবাসীকে মুক্ত করেছে। মুক্তি প্রাপ্তদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত, এবং তারা মূলত সাব‑সাহারান আফ্রিকার দেশগুলো থেকে এসেছেন। নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানান, এই ব্যক্তিদের অমানবিক পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে আটক রাখা হয়েছিল। মুক্তির খবর রবিবার কুফ্রা শহরের দুই নিরাপত্তা সূত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
কুফ্রা লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত, রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় এক হাজার সাতশো কিলোমিটার দূরে। ২০১১ সালে ন্যাটো‑সমর্থিত গণঅভ্যুত্থানের পর গাদ্দাফির পতনের ফলে দেশটি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা হ্রাসের মুখে পড়ে। সেই থেকে লিবিয়া আফ্রিকান ও মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসীদের ইউরোপের দিকে যাওয়ার প্রধান ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে, যেখানে মরুভূমি ও ভূমধ্যসাগরের বিপজ্জনক পথ অতিক্রম করতে হয়।
মুক্ত হওয়া অভিবাসীরা প্রধানত সোমালিয়া ও ইরিত্রিয়া সহ অন্যান্য সাব‑সাহারান দেশ থেকে এসেছেন। তাদের মধ্যে পরিবার, একক যাত্রিক এবং অল্পবয়সী শিশুরা রয়েছে, যা কারাগারের মানবিক অবস্থা সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। সূত্রগুলো উল্লেখ করে, আটকরা দীর্ঘ সময় ধরে অপর্যাপ্ত খাবার, পানীয় ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবে কষ্ট পেয়েছেন।
গোপন কারাগারের পরিবেশকে অমানবিক বলা হয়েছে; জানালা ও বায়ু চলাচল সীমিত, এবং মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা অনুপস্থিত। অভিবাসীরা সীমিত আলো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের অধীনে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নিন্দার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লিবিয়ার তেল‑নির্ভর অর্থনীতি বহু দরিদ্র কর্মীকে আকৃষ্ট করে, তবে নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা তাদের বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের ঝুঁকিতে ফেলে। সাম্প্রতিক সপ্তাহে পূর্ব লিবিয়ার একটি গণকবর থেকে অন্তত একুশ জন অভিবাসীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, যা অঞ্চলটির মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলেছে।
লিবিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল গত শুক্রবার একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানান, গণকবরের সঙ্গে যুক্ত একজন সন্দেহভাজনকে আদালতে পাঠিয়ে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে গুরুতর লঙ্ঘনের জন্য বিচার শুরু করা হবে। এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা লিবিয়ার আইনি কাঠামোর পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতি বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, লিবিয়ার এই ধরনের মানবিক লঙ্ঘন ইউরোপের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং সমাধানের জন্য বহুপাক্ষিক সহযোগিতা প্রয়োজন। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) ইতিমধ্যে লিবিয়ার নিরাপত্তা বিভাগকে আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ড মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও লিবিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর সংস্কার ও মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির জন্য আর্থিক সহায়তা প্রস্তাব করেছে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বলেন, লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা অভিবাসী স্রোতকে বাড়িয়ে তুলছে, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তা ও মানবিক চ্যালেঞ্জ উভয়ই তৈরি করছে। তিনি আরও যোগ করেন, গোপন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া অভিবাসীদের পুনর্বাসন ও সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকলে তারা আবার অনিরাপদ পথে ফিরে যেতে পারে।
লিবিয়ার সরকার এখন থেকে নিরাপত্তা ও শরণার্থী নীতি পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে রাজনৈতিক বিভাজন ও স্থানীয় গোষ্ঠীর স্বার্থের টানাপোড়েনের কারণে চ্যালেঞ্জ রয়ে যাবে। ভবিষ্যতে কুফ্রা ও অন্যান্য সীমান্ত অঞ্চলে মানবিক পর্যবেক্ষণ মিশন স্থাপন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং আইনি প্রক্রিয়ার ত্বরান্বিত করা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লিবিয়ার গোপন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া অভিবাসীদের ঘটনা দেশীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা, যা সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও কার্যকর নীতি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।



