রাশিয়ায় কাজের চুক্তি বাতিল হয়ে আজ ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩৫ জন বাংলাদেশি শ্রমিক ফিরে এলেন। কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে সন্ধ্যা ৫:৪৫ টায় অবতরণ করে তারা দেশের স্বাগত পেয়েছে। এই প্রত্যাবর্তন ব্র্যাকের একটি প্রেস রিলিজে জানানো হয়েছে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শারিফুল হাসান উল্লেখ করেন, এক্সপাট্রিয়েট ওয়েলফেয়ার ডেস্ক ও সিভিল এভিয়েশন সিকিউরিটি সংস্থার সমন্বয়ে বিমানবন্দরে কর্মীদের জন্য পরিবহন ও জরুরি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এ ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপ শ্রমিকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি বলেন।
প্রত্যাবর্তিত শ্রমিকদের মধ্যে গাইবান্ধা থেকে মোশিয়র রহমান, মানিকগঞ্জের আসমত আলী, ময়মনসিংহের হায়ুল মিয়া, সিরাজগঞ্জের আজাদুল হক, ঢাকার প্রসেনজিৎ রাজবংশী এবং চাপাইনবাবগঞ্জের মো. আবদুল্লাহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নামগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্যেক শ্রমিক গড়ে সাত লক্ষ টাকার বেশি খরচ করে রাশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
কর্মীরা জানান, বিদেশি কর্মসংস্থানের নামে তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তারা দাবি করেন, নিয়োগকারী সংস্থা কোনো স্পষ্ট কারণ না দিয়ে তাদের চাকরি বাতিল করে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। চুক্তিতে ফ্যাক্টরি শ্রমিক হিসেবে কাজের ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে তারা নির্মাণ কাজের দায়িত্বে নিযুক্ত হয়েছেন।
ব্র্যাকের রিলিজে উল্লেখ করা হয়েছে, মোট ১২০ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের চাকরি বাতিল ও প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া এখনো চলমান। আজকের ৩৫ জনের প্রত্যাবর্তন প্রথম ধাপের অংশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এই ধাপের পরবর্তী পর্যায়ে আরও শ্রমিকদের দেশে ফেরত আনা হবে বলে সংস্থা জানিয়েছে।
শ্রমিকরা জানান, জুলাই ২০২৫-এ একটি নিয়োগ সংস্থা তাদের রাশিয়ার জন্য ক্লিয়ারেন্স ডকুমেন্ট সহ পাঠায়। চুক্তিতে উল্লেখিত কাজের ধরণ এবং বাস্তব কাজের মধ্যে পার্থক্য তাদেরকে শোষণের শিকার করে তুলেছে। এই বিষয়টি শ্রমিকদের জন্য বড় আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি বয়ে এনেছে।
প্রত্যাবর্তনকারী শ্রমিকরা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা দাবি করেন, এই ঘটনার তদন্তে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নেওয়া এবং দায়ী সংস্থার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এ ধরনের দাবি দেশের শ্রম নীতি ও বিদেশি কর্মসংস্থান নীতির পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
এই ঘটনা বাংলাদেশ-রাশিয়া শ্রমিক চুক্তির ওপরও প্রশ্ন তুলেছে। রাশিয়ার শ্রম বাজারে বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদা কমে যাওয়া এবং নিয়োগ সংস্থার অনিয়মিত কার্যক্রমের ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কিছুটা চাপ সৃষ্টি হতে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও দু’দেশের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে বলে জানা যায়।
একজন কূটনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, রাশিয়ার শ্রমিক নীতি পরিবর্তন এবং বিদেশি শ্রমিকের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে এই ধরনের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি যোগ করেন, বাংলাদেশকে নিয়োগ সংস্থা নির্বাচন ও পর্যবেক্ষণে আরও কঠোর নিয়মাবলী প্রয়োগ করতে হবে।
এদিকে, লিবিয়ায় একই ধরনের প্রতারণা থেকে ৩০৯ জন বাংলাদেশি শ্রমিককে ফিরিয়ে আনার পূর্বের অভিজ্ঞতা এই ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। উভয় ক্ষেত্রে নিয়োগ সংস্থার অস্বচ্ছতা ও শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘনের সমন্বয় দেখা গেছে। এই ধারাবাহিকতা সরকারকে শ্রমিক সুরক্ষা নীতি শক্তিশালী করার সংকেত দিচ্ছে।
বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। টাস্ক ফোর্সের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে নিয়োগ সংস্থার লাইসেন্স যাচাই, চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে নীতি প্রণয়ন।
প্রত্যাবর্তনকারী শ্রমিকদের জন্য সরকার জরুরি আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে। পুনরায় কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও চাকরি মেলানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। এ ধরনের সহায়তা শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতি কমাতে এবং দেশের কর্মসংস্থান বাজারে পুনঃসংযোজন সহজ করতে লক্ষ্য রাখবে।
ব্র্যাক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টায় আজকের এই প্রত্যাবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে শ্রমিকদের অভিযোগের সমাধান ও দায়ী সংস্থার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।



