চট্টগ্রামের ৪০তম জাতীয় টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে বয়সসীমা উর্ধ্বে প্রতিদ্বন্দ্বী নাফিস ইকবালকে ৩-১ স্কোরে পরাজিত করে আবুল হাশেম হাসিব প্রথমবারের মতো পুরুষ একক শিরোপা জিতেছেন। এই সাফল্য তার দীর্ঘ সংগ্রাম ও চাইল্ড হেভেন ইন্টারন্যাশনাল অর্ফানেজের সমর্থনের ফল।
হাসিবের জন্মের তৃতীয় বছরে পিতার মৃত্যুর পর একক মা ও দাদার আর্থিক সংকটে শিশুটিকে চট্টগ্রামের অর্ফানেজে পাঠানো হয়। চাইল্ড হেভেন ইন্টারন্যাশনাল, যা পিতামহহীন, দারিদ্র্যগ্রস্ত, অক্ষম ও অবহেলিত শিশুদের জন্য কাজ করে, সেখানে তিনি নয় বছর কাটান। অর্ফানেজের পরিবেশে তিনি পিতার অনুপস্থিতি ভুলে গিয়ে বড় হতে পারেন এবং তার মা ও দাদার সমর্থন পেয়ে শিক্ষার পথে অগ্রসর হন।
২০১৯ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত একটি প্রশিক্ষণ শিবিরের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকিএসপি)‑এ ভর্তি হন এবং বর্তমানে গ্রেড-১২ শিক্ষার্থী। বিকিএসপি‑এর আর্থিক সহায়তা তার মাসিক শিক্ষাবর্ষের ফি বহন করে, যা অর্ফানেজের অব্যাহত সমর্থনের অংশ।
জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে একক শিরোপা ছাড়াও হাসিব তিনটি অতিরিক্ত শিরোপা অর্জন করেন। তিনি উ-১৯ বিভাগে পুরুষ দল ও মিশ্র ইভেন্টে জয়লাভ করেন, এবং সিনিয়র বিভাগে মিশ্র ইভেন্টেও শিরোপা জিতেছেন। একই সময়ে উ-১৯ পুরুষ ডাবলস ও পুরুষ ডাবলস (সিনিয়র) ইভেন্টে তিনি রানার‑আপ হন, আর পুরুষ দল ইভেন্টে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।
হাসিবের মতে, অর্ফানেজের পরিবেশ তার মানসিক শক্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, “অর্ফানেজে বড় হওয়ার সময় আমি পিতার অনুপস্থিতি অনুভব করিনি; পরিবেশই আমাকে সমর্থন দিয়েছে। এখন আমি আমার সাফল্য মা‑কে ভাগ করে নিতে চাই, যিনি সর্বদা আমার পাশে ছিলেন।”
একক শিরোপা তার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, যদিও তিনি গত বছর একটি র্যাঙ্কিং টুর্নামেন্টে জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। তিনি যোগ করেন, “জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে জুনিয়র শিরোপা জয় করা আরেকটি অনুভূতি। প্রতিটি প্যাডলার স্বপ্ন দেখে একক শিরোপা জিততে, আর আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।”
হাসিবের সাফল্য দেশের টেবিল টেনিসের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দিকেও ইতিবাচক সংকেত দেয়। তার পরবর্তী প্রতিযোগিতা বিকিএসপি‑এর অভ্যন্তরীণ টুর্নামেন্টে নির্ধারিত, যেখানে তিনি নিজেকে আরও উন্নত করতে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্বের প্রস্তুতি নিতে চান।
অর্ফানেজের পরিচালনা পরিষদও হাসিবের অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়ে ভবিষ্যতে আরও তরুণ ক্রীড়াবিদকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। তারা উল্লেখ করেছে, “অভিভাবকহীন শিশুদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করা আমাদের মূল লক্ষ্য, এবং হাসিবের সাফল্য তা প্রমাণ করে।”
এই বিজয় দেশের ক্রীড়া জগতে একটি উদাহরণস্বরূপ গল্প হিসেবে বিবেচিত হবে, যেখানে সামাজিক সহায়তা ও ব্যক্তিগত দৃঢ়সংকল্প মিলিয়ে অসাধারণ ফলাফল অর্জিত হয়েছে। ভবিষ্যতে হাসিবের মতো আরও তরুণ ক্রীড়াবিদকে সমর্থন করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।



