রাজশাহী, সরদা‑তে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির সহকারী সুপারিনটেনডেন্টের গ্র্যাজুয়েশন প্যারেডে হোম অ্যাডভাইজার লে. জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদি ১৫ লক্ষেরও বেশি পুলিশ কর্মী নির্বাচনী দায়িত্বে নিযুক্ত হন এবং তাদের কাজ পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন হয়, তবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে।
চৌধুরী বলেন, নির্বাচনী সময়ে পুলিশকে কোনো প্রার্থীর বা তার এজেন্টের আর্থিক উপহার গ্রহণ করা নিষিদ্ধ, পাশাপাশি কোনো প্রার্থীর প্রতিনিধির কাছ থেকে খাবার গ্রহণেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের রক্ষক নয়; তারা করদাতার অর্থে নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের কর্মী।” তার মতে, পুলিশের মূল দায়িত্ব হল জনগণের সেবা করা এবং আইনের শাসন বজায় রাখা।
নির্বাচনী নিরাপত্তা সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, শুধুমাত্র বলপ্রয়োগে শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়; জনগণের বিশ্বাস অর্জন ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। এ জন্য পুলিশকে জনসাধারণের সঙ্গে সংলাপ বাড়াতে হবে এবং ন্যায়সঙ্গত আচরণ বজায় রাখতে হবে। তিনি জানান, প্রায় এক লক্ষ পুলিশ কর্মীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে, যাতে তারা স্বাধীন ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন পরিচালনা করতে সক্ষম হয়।
প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত চাপ ও সমালোচনা সম্পর্কে চৌধুরী মন্তব্য করেন, সততা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। তিনি একটি স্বচ্ছ, গর্বিত ও মানবিক পুলিশ বাহিনীর গঠনকে আহ্বান জানান, যা দুর্নীতি ও পক্ষপাত থেকে মুক্ত থাকবে এবং জনগণের ত্যাগ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করবে।
প্যারেডে ৪১তম বিএসএস (পুলিশ) ব্যাচের ৯৬জন প্রশিক্ষণার্থীকে অফিসিয়ালভাবে সেবায় যোগদান করানো হয়। এই ব্যাচের প্রশিক্ষণ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে শুরু হয়েছিল। প্যারেডের কমান্ডিং দায়িত্ব পালন করেন প্রোবেশনারি অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট ধিমন কুমার মন্ডল।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হোম মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সেক্রেটারি নাসিমুল গনি, ইন্টারসার্জেনাল জেনারেল অফ পুলিশ বাহরুল আলম, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রধান তৌফিক মাহবুব চৌধুরী এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
রাজনৈতিক দলগুলোও চৌধুরীর মন্তব্যের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। বিরোধী দলগুলো উল্লেখ করেছে, অতীতের নির্বাচনে পুলিশের পক্ষপাতের অভিযোগ ছিল, তাই এখনের এই স্পষ্ট নির্দেশনা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াবে বলে তারা আশাবাদী। সরকারী দলও চৌধুরীর আহ্বানকে সমর্থন জানিয়ে, সকল প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য পুলিশের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, যদি পুলিশ সত্যিই আর্থিক ও খাবারের উপহার গ্রহণ থেকে বিরত থাকে এবং জনসাধারণের বিশ্বাস অর্জনে মনোযোগ দেয়, তবে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নের মুখে না এনে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। তবে তারা সতর্ক করেন, বাস্তবায়নে তদারকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া এই নীতিগুলো কেবল কাগজে থাকা শব্দই রয়ে যাবে।
চৌধুরীর বক্তব্যের ভিত্তিতে, নির্বাচন কমিশনও ইতিমধ্যে নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে এবং নির্বাচনী সময়ে পুলিশের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তদারকি কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি নির্বাচনের পূর্বে, চলাকালীন এবং পরবর্তী পর্যায়ে পুলিশের আচরণ পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
সারসংক্ষেপে, হোম অ্যাডভাইজার জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর এই আহ্বান দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৫০,০০০ পুলিশ কর্মীর পেশাদারিত্ব, আর্থিক স্বার্থের পরিহার এবং জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলাই আগামী নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার মূল চাবিকাঠি হবে।



