ব্রাজিলের প্রাক্তন ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো, ২০২২ সালে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ২৭ বছর জেল শাস্তি পেয়ে গেছেন। ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি, দেশের সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক তার আইনজীবীদের আবেদন গ্রহণ করে তাকে ‘বই পড়ার মাধ্যমে সাজা হ্রাস’ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি দেন।
ব্রাজিলের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, কোনো দোষী ব্যক্তি একটি করে বই সম্পূর্ণ করলে তার শাস্তি চার দিন করে কমে যায়। এই বিধান ব্যবহার করে বলসোনারো এখন জেলখাতের মেয়াদ কয়েক মাস কমাতে চান। তিনি যে বইগুলো পড়বেন, সেগুলো তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী, যা সরকারী নথি ও গার্ডিয়ান সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রস্তাবিত তালিকায় আদিবাসী অধিকার, বর্ণবৈষম্য বিরোধী, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ১৯৬৪‑১৯৮৫ সালের সামরিক স্বৈরতন্ত্রের নৃশংসতা নিয়ে লেখা কাজগুলো অন্তর্ভুক্ত। তালিকায় আনা মারিয়া গনকালভসের ৯৫০ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘উম ডিফিটো ডি কর’ রয়েছে, যা একটি কৃষ্ণাঙ্গ নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে ব্রাজিলের ইতিহাসকে উপস্থাপন করে। এছাড়া ফিলিপ বান্টিংয়ের শিশুদের জন্য রচিত ‘ডেমোক্রেসি!’ নামের চিত্রিত বইটিও পড়তে হবে।
বই পড়ার পাশাপাশি, বলসোনারোকে প্রতিটি বই শেষ করার পর জেল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এই প্রতিবেদনগুলোতে তিনি বইয়ের মূল বিষয়বস্তু ও তার থেকে পাওয়া ধারণা সংক্ষেপে উপস্থাপন করবেন। তালিকায় লিও তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এবং মিগুয়েল ডি সার্ভান্তিসের ‘ডন কিহোতে’ মতো এক হাজার পৃষ্ঠার অধিক বিশাল ক্লাসিক সাহিত্যকর্মও রয়েছে, যা তার পূর্বের প্রকাশ্য মন্তব্যের সঙ্গে বৈপরীত্য গড়ে তুলেছে।
বলা হয়, বলসোনারো পূর্বে তিন বছর ধরে কোনো বই না পড়ার কারণ হিসেবে সময়ের অভাব উল্লেখ করতেন। এখন, দীর্ঘ শাস্তি হ্রাসের লক্ষ্যে, তাকে এই বিশাল গ্রন্থগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। বর্তমানে তিনি ব্রাসিলিয়ার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টিত কারাগারে বন্দি, যেখানে তার দৈনন্দিন রুটিনে এই পাঠ্যক্রম যুক্ত করা হবে।
২০১৮ সালের নির্বাচনের সময়, বলসোনারো একবার কর্নেল কার্লোস আলবার্তো ব্রিলহান্তে উস্ত্রার একটি বইকে তার প্রিয় গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করেন। উস্ত্রা সামরিক শাসনকালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন, যা তার পূর্বের সামরিক শাসনের সমর্থনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখন, একই শাসনের শিকারদের অধিকার ও নৃশংসতার ওপর ভিত্তি করে লেখা বইগুলো পড়তে বাধ্য করা, তার রাজনৈতিক অবস্থানের একটি তীব্র পরিবর্তন নির্দেশ করে।
বই-ভিত্তিক শাস্তি হ্রাসের এই ব্যবস্থা ব্রাজিলের বিচার ব্যবস্থায় একটি বিরল উদাহরণ, যা দণ্ডের মানবিক দিককে জোরদার করে। তবে, আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি কেবলমাত্র শাস্তি হ্রাসের একটি প্রক্রিয়া, যা সকল দোষীর জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ভবিষ্যতে, এই ধরনের প্রোগ্রাম কতটা কার্যকর হবে এবং অন্য দোষীদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপটি বলসোনারোর দীর্ঘমেয়াদী জেল শাস্তি হ্রাসের কৌশল হতে পারে, তবে তা একই সঙ্গে দেশের মানবাধিকার ও ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়নের একটি সুযোগও প্রদান করে। সরকার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই প্রোগ্রামের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে, যাতে পাঠ্যক্রমের লক্ষ্যবস্তু ও শর্তাবলী যথাযথভাবে পালন হয়।
সারসংক্ষেপে, জেইর বলসোনারো এখন একটি আইনগত পথ বেছে নিয়েছেন, যার মাধ্যমে তিনি প্রতিটি বই পড়ার পর চার দিন করে শাস্তি হ্রাসের দাবি করতে পারেন। এই প্রক্রিয়ায় তাকে আদিবাসী, বর্ণবৈষম্য বিরোধী এবং সামরিক শাসনের নৃশংসতা নিয়ে লেখা গ্রন্থগুলো পড়তে হবে, এবং প্রতিটি পাঠের পর লিখিত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। তার এই পদক্ষেপের ফলাফল, পাশাপাশি এই ধরনের শাস্তি হ্রাসের নীতি কীভাবে ভবিষ্যতে প্রয়োগ হবে, তা দেশের বিচারিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে যাবে।



