দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হবে দেশের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন, যার নির্ধারিত তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি। ভোটের ফলাফল কেবল শাসনকর্তা কে হবে তা নয়, বরং বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক আত্মা পুনরুদ্ধার করবে নাকি আরও গভীর বিভাজনের পথে অগ্রসর হবে, তা নির্ধারণের মূল মুহূর্ত হবে।
ইতিহাসের দৃষ্টিতে দেখা যায়, দেশের গণতান্ত্রিক প্রবণতা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু হয়েছে, যখন ছাত্ররা বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করে। এই সংগ্রাম ভাষা সংরক্ষণের চেয়ে বৃহত্তর একটি জাতীয় জাগরণে রূপান্তরিত হয় এবং আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পায়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়, নির্বাচনের ফলাফল অস্বীকারের পরিপ্রেক্ষিতে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে এবং একটি সংবিধান গৃহীত হয়, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের নীতি অন্তর্ভুক্ত। এই সময়ে একটি দারিদ্র্যপূর্ণ, যুদ্ধে ধ্বস্ত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ দেখিয়েছে যে গণতন্ত্র ও ধর্মীয় পরিচয় একসাথে বিদ্যমান থাকতে পারে।
এরপরের দশকগুলোতে সামরিক অভ্যুত্থান, সামরিক শাসন এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলে দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবুও প্রতিবার যখন শাসন ব্যবস্থাকে বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়, জনগণ তা ভেঙে নতুন করে গণতন্ত্রের দরজা খুলে দেয়। ১৯৯০ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতন, ২০০৭-২০০৮ সালের কেয়ারটেকার সংকট এবং ২০২৪ সালে ছাত্র ও তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের প্রতিবাদে গণতান্ত্রিক চাহিদা পুনরায় উদ্ভাসিত হয়েছে।
ইলেকশন ম্যানেজারদের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ নির্বাচন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দু’ধরনের শিক্ষা দেয়: সতর্কতা এবং অনুপ্রেরণা। ১৯৯০-এর দশকে প্রবর্তিত কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা, যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে নির্ভরযোগ্য ভোট নিশ্চিত করার জন্য উদ্ভাবিত হয়, তখন তা একটি উদ্ভাবনী পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করে। ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনকে এখনও দেশের সর্বোত্তম নির্বাচন হিসেবে স্মরণ করা হয়।
কিন্তু একই সময়ে এই ব্যবস্থা প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে যে, যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের ফাঁক বড় হয়, তখন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। বর্তমান নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন, ইলেকশন কমিশন বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, যাতে ভোটার তালিকা পরিষ্কার হয়, ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা পায় এবং ফলাফল দ্রুত ও সঠিকভাবে ঘোষিত হয়।
যদি এই নির্বাচন স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে সম্পন্ন হয়, তবে বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক আত্মবিশ্বাস পুনর্নির্মাণে সক্ষম হবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্য একটি মডেল স্থাপন করবে। অন্যদিকে, যদি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, হস্তক্ষেপ বা রাজনৈতিক হিংসা দেখা দেয়, তবে তা দেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজন বাড়িয়ে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
অতএব, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ভোটারদের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সকল রাজনৈতিক শক্তির ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণে মূল ভূমিকা রাখবে। এই নির্বাচনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে পুনরায় জোরদার করবে নাকি আরও গভীর রাজনৈতিক ধ্রুবতায় নিমজ্জিত হবে।



