বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পকে সমর্থন করার জন্য দশকের পর দশক ধরে সুতা আমদানি‑বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হয়ে আসছে। তবে প্রতিবেশী দেশ থেকে কম দামে সুতা ঢুকে আসার ফলে দেশীয় সুতা কারখানাগুলো বিক্রয় হ্রাস ও আর্থিক সংকটে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১২ জানুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)‑কে চিঠি লিখে নির্দিষ্ট গুণের সুতা বন্ড‑সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ জানায়।
প্রস্তাবিত প্রত্যাহার শুধুমাত্র ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, যা বন্ডের আওতায় সর্বাধিক পরিমাণে আমদানি হয়। কাউন্ট সংখ্যা যত বেশি, সুতা ততই পাতলা হয়; কম কাউন্টের সুতা মোটা ও ভারী হয়। মন্ত্রণালয় সব ধরনের সুতা বন্ড‑সুবিধা বাতিল করতে চায়নি, বরং এই দুই গোষ্ঠীর ওপর সীমা আরোপ করতে চায়।
বন্ড‑সুবিধা থাকলে আমদানিকৃত সুতা শুল্ক ও কর থেকে মুক্ত থাকে, সংরক্ষণের জন্য অনুমোদিত বন্ডেড গুদামে রাখা যায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি করতে হয়। এই ব্যবস্থা উদ্যোক্তাদের কাঁচামালের খরচ কমিয়ে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে, ফলে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ে। তবে সাম্প্রতিক দুই অর্থবছরে বন্ড‑সুবিধা ব্যবহার করে সুতা আমদানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশীয় সুতা বিক্রয়কে চাপে ফেলেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, বন্ড‑সুবিধা চালু থাকলে দেশীয় সুতা কারখানাগুলো তাদের উৎপাদনক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশই ব্যবহার করতে পারছে। অতিরিক্তভাবে, আর্থিক ক্ষতির মুখে প্রায় পঞ্চাশটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট কারখানাগুলোও যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)ও বন্ড‑সুবিধা প্রত্যাহারের পক্ষে মত প্রকাশ করেছে। কমিশন উল্লেখ করেছে, বন্ড‑সুবিধা ছাড়া দেশীয় সুতা উৎপাদন পুনরুদ্ধার করা এবং রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিযোগিতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, বন্ড‑সুবিধা প্রত্যাহার না হলে গার্মেন্টস কারখানাগুলো ক্রমশ আমদানি করা সুতা উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের পোশাক শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
সরকারের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হল দেশীয় সুতা উৎপাদনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পকে স্বল্পমেয়াদী ব্যয় সাশ্রয়ের পরিবর্তে টেকসই প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা প্রদান করা।
বন্ড‑সুবিধা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এনবিআরের হাতে থাকবে, কারণ আর্থিক নীতি ও রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব এই সংস্থার অধীনে। মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এনবিআরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি বন্ড‑সুবিধা সীমিত করা হয়, তবে দেশীয় সুতা উৎপাদন পুনরায় বাড়বে, ফলে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামাল ব্যয়ের কাঠামো পরিবর্তিত হবে। তবে স্বল্পমেয়াদে কিছু কারখানার জন্য আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, যা উৎপাদন পরিকল্পনায় সাময়িক সমন্বয় প্রয়োজন করবে।
অবশেষে, বন্ড‑সুবিধা প্রত্যাহার বা সীমাবদ্ধতা দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি রাজস্ব বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার এই নীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি বৃদ্ধি এবং শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায়।
এই প্রস্তাবের পরবর্তী ধাপ হবে এনবিআরের পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত অনুমোদন, যা নীতি কার্যকর হওয়ার সময়সূচি নির্ধারণ করবে। সংশ্লিষ্ট শিল্প সংস্থাগুলোও এই পরিবর্তনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় পরিকল্পনা করবে।



