১ জানুয়ারি ১৮ তারিখে বাংলা ভাষাভাষী শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক সৈয়দ মানজুরুল ইসলামকে স্মরণ করা হয়। তিনি কয়েক মাস আগে আর আমাদের মাঝে নেই, তবু তার জন্মদিনে তার শিক্ষাগত অবদান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পুনরায় আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়।
ইংরেজি বিভাগে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করা মানজুরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বিশিষ্ট অধ্যাপক ছিলেন। তার পাঠদান কেবল পাঠ্যপুস্তকের সীমা অতিক্রম করে, শিক্ষার্থীদের চিন্তাধারাকে গঠনমূলকভাবে প্রভাবিত করত।
শিক্ষকের ক্লাসরুমে সাহিত্যকে শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়, বরং জীবনের দৃষ্টিকোণ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। শেক্সপিয়ার, ইলিয়ট, ওয়ার্ডসওর্থ, ইয়েটস, ডিকেন্স এবং ডি.এইচ. লরেন্সের রচনাগুলোকে তিনি সময় ও স্থানের সীমানা অতিক্রমকারী মানবিক উদ্বেগের প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করতেন।
তার শিক্ষাদানের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল নীরব অথচ দৃঢ় নৈতিকতা। তিনি জোর দিতেন যে সাহিত্যিক কাজগুলোকে বিশ্লেষণ করার সময় পাঠ্যবস্তুকে সামাজিক ও নৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। ফলে শিক্ষার্থীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো-খারাপের প্রচলিত ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে নতুন দৃষ্টিকোণ গড়ে তুলতে পারত।
মানজুরুল ইসলাম কেবল তত্ত্বে সীমাবদ্ধ না থেকে অনুবাদ কাজেও সক্রিয় ছিলেন। তার অনুবাদগুলোতে মূল রচনার সুর ও ভাব বজায় রেখে বাংলা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই কাজের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্যকে স্থানীয় পাঠকের সঙ্গে যুক্ত করার সেতু গড়ে তুলেছিলেন।
শিক্ষক হিসেবে তার উপস্থিতি স্বভাবিকভাবে কেন্দ্রীয় হয়ে উঠত। তিনি নিজে কোনো প্রচার না করেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্মান ও অনুসরণ গড়ে উঠত। তার বক্তৃতা ও আলোচনায় স্পষ্টতা, গভীরতা এবং নৈতিক গম্ভীরতা ছিল, যা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করত।
তার শিক্ষার পদ্ধতি ছিল প্রশ্নভিত্তিক। তিনি শিক্ষার্থীদের ঐতিহ্যবাহী ধারণা ও সামাজিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে উত্সাহিত করতেন, যাতে তারা ঐতিহ্যকে স্থির নয়, বরং চলমান সংলাপের অংশ হিসেবে দেখতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করত।
একজন শিক্ষকের জন্য পাঠ্যবইয়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের জীবনে প্রভাব ফেলা স্বাভাবিক, তবে মানজুরুলের ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে স্পষ্ট ছিল। তার শিক্ষার ফলে বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থী সাহিত্যকে জীবনের নৈতিক দিশা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
আজকের এই স্মরণে তার শিক্ষার মূল বিষয়গুলো পুনরায় বিবেচনা করা দরকার। প্রথমত, সাহিত্যকে মানবিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা; দ্বিতীয়ত, অনুবাদকে সাংস্কৃতিক সংযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা; তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বতন্ত্র চিন্তাধারার বিকাশে উৎসাহ প্রদান।
শিক্ষা ক্ষেত্রের বর্তমান চ্যালেঞ্জের মুখে এই নীতিগুলো পুনরায় প্রয়োগ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আধুনিক পাঠ্যক্রমে আন্তর্জাতিক সাহিত্যকে অন্তর্ভুক্ত করার সময় মানজুরুলের অনুবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা বিশ্বজনীন মানবিক বিষয়বস্তুতে প্রবেশ করতে পারে।
অবশেষে, তার স্মরণে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ব্যবহারিক প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়: আপনার বর্তমান পাঠ্যক্রমে কীভাবে সাহিত্যকে নৈতিক ও সামাজিক আলোচনার সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা মানজুরুলের শিক্ষার ধারাকে নতুন প্রজন্মে চালিয়ে নেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।



