স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ রবিবারের একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযান চালায়, তা ন্যাটো জোটের জন্য মারাত্মক ক্ষতি হবে এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সর্বোচ্চ আনন্দে ভাসিয়ে তুলবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পদক্ষেপকে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণকে বৈধতা প্রদানকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, আর্কটিকের বৃহত্তম দ্বীপ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত। এই অঞ্চলকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ছে, বিশেষ করে সামরিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে।
সানচেজের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপ ন্যাটোর ঐক্যকে দুর্বল করবে এবং রাশিয়ার ইউক্রেনের ওপর চলমান যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি পেতে সাহায্য করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, এমন একটি পদক্ষেপ ন্যাটোর জন্য মৃত্যুঘণ্টা হিসেবে কাজ করবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করে, তবে পুতিন দ্বিগুণ আনন্দে ভাসবেন, কারণ তার আক্রমণকে বৈধতা পাওয়া মানে তার কৌশলগত লক্ষ্যগুলোকে সমর্থন করা। এই মন্তব্যগুলো স্পেনের সরকারকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনায় সক্রিয় অবস্থান গ্রহণের ইঙ্গিত দেয়।
সানচেজের বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “যদি আমরা গ্রিনল্যান্ডের দিকে তাকাই, তবে স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ পুতিনকে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ করে তুলবে, কারণ এটি তার ইউক্রেন আক্রমণকে বৈধতা দেবে।” এই বাক্যটি তার উদ্বেগকে সংক্ষেপে প্রকাশ করে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক একটি পোস্টে গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি ট্রুথ সোশ্যালের মাধ্যমে জানিয়েছেন যে, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে।
ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেছেন যে, ১ জুন থেকে এই শুল্কের হার ২৫ শতাংশে বৃদ্ধি করা হবে এবং গ্রিনল্যান্ডের বিক্রয় চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক ব্যবস্থা চালু থাকবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়েই তিনি সন্তুষ্ট হবেন না।
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দ্বীপটি বিক্রির জন্য নয় এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না। তাদের মতে, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও পরিবেশগত গুরুত্বকে রক্ষা করা অগ্রাধিকার।
এই পরিস্থিতিতে ন্যাটো জোটের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ বাড়তে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতি ও গ্রিনল্যান্ডের সম্ভাব্য অধিগ্রহণকে তাদের স্বার্থের হুমকি হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে, রাশিয়া এই বিকাশকে তার কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের যদি গ্রিনল্যান্ডে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে তা ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং ন্যাটোর সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য নীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
ভবিষ্যতে কী হবে তা এখনও অনিশ্চিত, তবে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য ইউরোপীয় নেতাদের সতর্কতা যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক পথে সমস্যার সমাধান খুঁজতে বাধ্য করতে পারে। ন্যাটো জোটের অভ্যন্তরে সমন্বয় বজায় রাখতে এবং রাশিয়ার আক্রমণকে বৈধতা না দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সংক্ষেপে, গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করবে, রাশিয়ার কৌশলগত লক্ষ্যকে সমর্থন করবে এবং ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে জটিল করবে। স্পেনের সরকার এই ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করে, আর ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতৃত্ব দ্বীপের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে।



