বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের গতিবেগ এখন দেশের রেলবাহিনীর ক্ষমতার চেয়ে দ্রুত। চট্টগ্রাম গন্তব্যে কন্টেইনার ট্রেনগুলো ধারাবাহিকভাবে দেরি, বাতিল বা যাত্রী সেবার জন্য পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ফলে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ডিপো (ICD) গুলো অতিরিক্ত ভিড়ের শিকার। এই পরিস্থিতি সড়ক পরিবহনের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং বন্দরগুলোর কাজকেও প্রভাবিত করছে।
বর্তমান রেলবাহিনীর নীতি যাত্রী গাড়িকে অগ্রাধিকার দেয়, ফলে মালামাল গাড়ির জন্য পর্যাপ্ত লোকোমোটিভের অভাব দেখা দেয়। রেলপথে মালামাল গাড়ি চালানোর জন্য কোনো নিবেদিত লোকোমোটিভ নেই, ফলে যাত্রী গাড়ির ব্যর্থতা বা রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কারণে রাতের কন্টেইনার ট্রেনগুলো প্রায়শই বাতিল হয়ে যায়। এই একতরফা পদ্ধতি মালামাল গাড়ির নির্ভরযোগ্যতা ও পূর্বাভাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা কঠিন করে তুলেছে।
এই সমস্যার সমাধান কেবল সরঞ্জাম ক্রয় বা ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে নয়, বরং রেলপথের ব্যবহারিক নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বিশেষ করে, বেসরকারি মালামাল রেলগাড়ি পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর জন্য রেলপথের প্রবেশাধিকার প্রদান করা উচিত। এতে রপ্তানিকারক, লজিস্টিক ফার্ম এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিজেদের লোকোমোটিভ, গাড়ি ও ক্রু ব্যবহার করে রেলপথে মালামাল গাড়ি চালাতে পারবে, তবে রেলপথের মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা তত্ত্বাবধান এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ রেলওয়ের হাতে থাকবে।
এই মডেলটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সফল। প্রায় দুই দশক আগে ভারত রেলওয়ের ট্র্যাকের ওপর কন্টেইনার গাড়ি চালানোর অনুমতি বেসরকারি সংস্থাগুলোর জন্য খুলে দেয়। আজকের দিনে বহু কোম্পানি নিজস্ব গাড়ি চালিয়ে রেলওয়ে ট্র্যাকে ফি প্রদান করে কাজ করছে, যা রেলবাহিনীর আয় বাড়াচ্ছে এবং মালামাল পরিবহনের গতি বাড়াচ্ছে।
বেসরকারি অপারেটরদের রেলপথে প্রবেশের মাধ্যমে রেলবাহিনীর একচেটিয়া মালামাল গাড়ি পরিচালনা শেষ হবে, ফলে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং সেবা মান উন্নয়ন সম্ভব হবে। রেলফ্রেটের সময়সূচি নির্ভরযোগ্য হলে ICD গুলোর ভিড় কমবে, সড়ক পরিবহন কমে যাবে এবং বন্দরগুলোর লোডিং-আনলোডিং প্রক্রিয়াও দ্রুত হবে। ফলে রপ্তানি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়বে।
তবে এই রূপান্তরের জন্য স্বচ্ছ নিয়মাবলি, নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং ট্রাফিক সমন্বয় ব্যবস্থা প্রয়োজন। রেলপথের ক্ষমতা, স্লট বরাদ্দ এবং ফি কাঠামো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা উচিত, যাতে বেসরকারি গাড়ি ও যাত্রী গাড়ির মধ্যে সংঘর্ষ না হয়। এছাড়া রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট সময়ে মালামাল গাড়ির জন্য নিবেদিত লোকোমোটিভ ও রেলপথের অংশ তৈরি করতে হবে, যাতে সেবা ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
নিয়মাবলি প্রণয়নের পাশাপাশি রেলওয়ে ট্র্যাকের আধুনিকীকরণ, সিগন্যালিং সিস্টেমের আপডেট এবং ডেটা শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা জরুরি। এইসব পদক্ষেপ একসাথে রেলফ্রেটের দক্ষতা বাড়াবে এবং রেলপথের ব্যবহারিক ক্ষমতা সর্বোচ্চ করবে।
যদি এই নীতি বাস্তবায়িত হয়, তবে রেলফ্রেটের ক্ষমতা রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং লজিস্টিক সেক্টরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোও বৈচিত্র্যময় হবে, কারণ রেলফ্রেটের উন্নতি সরাসরি উৎপাদন, রপ্তানি ও বাণিজ্যিক পরিবেশকে শক্তিশালী করবে।
সারসংক্ষেপে, রেলপথের একচেটিয়া মালামাল গাড়ি পরিচালনা বন্ধ করে বেসরকারি অপারেটরদের প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা বাংলাদেশের লজিস্টিক অবকাঠামোকে আধুনিকায়নের অন্যতম কৌশল। এই পদক্ষেপ রেলফ্রেটের নির্ভরযোগ্যতা, সময়মত ডেলিভারি এবং খরচ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, যা রপ্তানি খাতের ধারাবাহিক বৃদ্ধিকে সমর্থন করবে।



