বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের গবেষক দল কক্সবাজারের সাগরদ্বীপ মহেশখালীর সোনাদিয়ায় বন্ধ্যা মাছি (স্টেরাইল ফ্লাই) ব্যবহার করে বিষমুক্ত শুঁটকি তৈরির পাইলট প্রকল্প চালু করেছে। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল শুঁটকি উৎপাদনের সময় মাছিতে লার্ভা দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতি কমিয়ে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা।
প্রকল্পের প্রথম ধাপে টানা কয়েক বছর ধরে প্রায় নয় মিলিয়ন বন্ধ্যা মাছি পরিবেশে মুক্তি দেওয়া হয়। এই পদ্ধতি মূলত লুসিলিয়া কিউপ্রিনা প্রজাতির মাছি ডিম পেড়ে লার্ভা উৎপন্ন হওয়া রোধ করে, যা সাধারণত শুকনো মাছের পৃষ্ঠে লেগে গিয়ে মাছের মাংস খেয়ে নষ্ট করে দেয়।
দেশে প্রতি বছর প্রায় তের লাখ মেট্রিক টন সামুদ্রিক ও মিঠা পানির মাছ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় পনেরো শতাংশ মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকিতে রূপান্তরিত হয়, যা স্থানীয় বাজারে ও রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে শুকানোর সময় লুসিলিয়া কিউপ্রিনার ডিম পেড়ে লার্ভা উৎপন্ন হলে শুঁটকির গুণমান হ্রাস পায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, শুঁটকি শুকানোর সময় এই মাছি ডিম পেড়ে গড়ে দুইশ থেকে তিনশটি ডিম পেড়ে দেয়, এবং দশ থেকে বারো ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। লার্ভা মাছের মাংস খেয়ে নষ্ট করে, ফলে শুঁটকির প্রায় ষাট শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষতি আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে কমপক্ষে তিনশো কোটি টাকার সমান।
শুঁটকি উৎপাদনকারীরা ঐতিহ্যগতভাবে মাছের পৃষ্ঠে বিষাক্ত কীটনাশক ও অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করে মাছি দূর করার চেষ্টা করেন। যদিও এই পদ্ধতি মাছি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়তা করে, তবে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ শুঁটকিতে মিশে যায়, যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করে।
সোনাদিয়ায় পরিচালিত পরীক্ষামূলক উৎপাদনে বন্ধ্যা মাছি প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুঁটকি প্রস্তুত করা হয় এবং স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য রাখা হয়। পরীক্ষার ফলাফল দেখায় যে ঐ অঞ্চলে উৎপাদিত শুঁটকির গুণমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে এবং বিষের উপস্থিতি কমে এসেছে।
তবে একই সময়ে কক্সবাজারের নাজিরারটেক, সমিতিপাড়া, খুরুশকুল ও মহেশখালীর বিভিন্ন মহাল এবং শহরের দোকানে বিক্রিত শুঁটকির নমুনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় আশি শতাংশ শুঁটকিতে এখনও মারাত্মক ক্ষতিকর বিষ সনাক্ত হয়েছে। এই বিষ মূলত মাছি দূর করতে ব্যবহৃত কীটনাশক থেকে আসে।
বিষের প্রয়োগের প্রক্রিয়া সহজ: কাঁচা মাছকে ধুয়ে রোদে শুকানোর আগে কীটনাশক দিয়ে স্প্রে করা হয়। স্প্রে করা মাছের পৃষ্ঠে কীটনাশক শোষিত হয়ে শুঁটকিতে অবশিষ্ট থাকে, ফলে শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের হাতে পৌঁছানো পণ্যটি বিষাক্ত হয়ে যায়।
বিষাক্ত শুঁটকি নিয়মিত সেবন করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং ক্যান্সার, লিভার, ফুসফুস, কিডনি ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে গর্ভপাতের সম্ভাবনা এবং শিশুর জন্মগত বিকলাঙ্গতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
এই স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশে শুঁটকি রপ্তানি এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে স্বীকৃতি পায়নি। বিদেশি ক্রেতারা নিরাপদ ও মানসম্পন্ন পণ্য চায়, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে নিশ্চিত করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, বন্ধ্যা মাছি প্রযুক্তি বিস্তৃতভাবে গ্রহণের পাশাপাশি কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে জৈব পদ্ধতি ও নিরাপদ সংরক্ষণ প্রযুক্তি উন্নয়ন করা দরকার। আপনি কি শুঁটকি ব্যবহার করার সময় নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন? আপনার মতামত শেয়ার করুন।



