বহু বছর ধরে বলিউডের সুরকার হিসেবে স্বীকৃত এ আর রহমান সম্প্রতি প্রকাশ্যে জানান যে, গত আট বছরে তার কাজের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, শিল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এখন এমন ব্যক্তিদের হাতে রয়েছে, যারা সৃজনশীল নয় এবং এ পরিস্থিতি ধর্মীয় মেরুকরণের প্রভাবেও হতে পারে। এই মন্তব্যের পর ভারতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ঘরে তীব্র আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে।
রহমানের বক্তব্যের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আতাওয়াল, বিজেপি বিধায়ক জিতেন্দ্র কুমার গোথওয়াল এবং সংখ্যালঘু মোর্চার সভাপতি সহ বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তার অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, শিল্পের সুযোগের হ্রাসের কারণ হিসেবে ধর্মীয় বৈষম্যকে সরাসরি প্রমাণ করা কঠিন এবং এ ধরনের অভিযোগকে যথাযথ প্রমাণ ছাড়া অনুমান হিসেবে দেখেন।
বিপিএন পার্টির শাসনকালে হিন্দি সিনেমায় ধর্মীয় মেরুকরণের মাত্রা বাড়েছে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মতামত উঠে এসেছে। বিরোধী শিবিরের দৃষ্টিকোণ থেকে বলিউডে মুসলিম শিল্পীদের কাজের সুযোগ কমে যাওয়া একটি বাস্তব সমস্যা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যেখানে সরকারী দিক থেকে তা অস্বীকার করা হয়েছে।
এই বিতর্কের মাঝখানে আরেকজন জনপ্রিয় সুরকার শান তার মতামত প্রকাশ করেন। শান জানান, তিনি নিজের ক্যারিয়ারে বহু হিট গান গেয়েছেন, তবু কখনো কখনো কাজের অভাব অনুভব করেন, তবে তা ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করেন না। তিনি এ আর রহমানের সৃষ্টিশীল দক্ষতাকে স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, তার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে এবং শিল্পে তার অবদান অস্বীকার করা যায় না।
শান আরও উল্লেখ করেন, শিল্প ও সংস্কৃতিতে কোনো ধর্মীয় বৈষম্য নেই বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি উদাহরণস্বরূপ তিনজন সুপারস্টারকে উল্লেখ করেন, যাদের ধর্মীয় পরিচয় সংখ্যালঘু হলেও তারা বহু বছর ধরে বলিউডে সফলভাবে কাজ করে আসছেন। শান বলেন, যদি শিল্পে সত্যিকারের ধর্মীয় বাধা থাকত, তবে এই সুপারস্টারদের ক্যারিয়ার এত দীর্ঘ হতো না।
শানের মতে, শিল্পের মূল লক্ষ্য হল ভালো কাজ এবং সৃজনশীল সঙ্গীত তৈরি করা, আর তা নিয়ে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ করা দরকার নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিল্পের উন্নতি এবং গুণগত মান বজায় রাখতে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত, তবে তা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, প্রকৃত প্রতিভা ও পরিশ্রমের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
বিবেচনা করা যায়, এ আর রহমানের অভিযোগ এবং শানের প্রতিক্রিয়া দুটোই বলিউডের বর্তমান পরিবেশের বিভিন্ন দিককে উন্মোচিত করেছে। একদিকে শিল্পের সুযোগের হ্রাসের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধর্মীয় মেরুকরণকে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্যদিকে তা অস্বীকার করে শিল্পের গুণগত মান এবং সবার সমান সুযোগের পক্ষে কথা বলা হয়েছে।
এই আলোচনার ফলে শিল্পের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে আরও গভীর বিশ্লেষণ এবং নীতি নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। শিল্পের বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এবং সৃজনশীলতা বজায় রাখতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
বিনোদন জগতে কাজের সুযোগের পরিবর্তন, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। তবে শিল্পের স্বচ্ছতা এবং ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিত করা হলে, ভবিষ্যতে এমন বিতর্কের সম্ভাবনা কমে যাবে।
শিল্পের বিভিন্ন স্তরে কাজের সুযোগের সমতা, সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। এ আর রহমান এবং শানের মতামত এই দিকের আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে, যা শিল্পের নীতি নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।
বিনোদন ও সংস্কৃতি বিভাগের দায়িত্ব হল এই ধরনের বিষয়গুলোকে ন্যায়সঙ্গতভাবে সমাধান করা এবং শিল্পী সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা করা। এ রকম বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, শিল্পের স্বচ্ছতা, সুযোগের সমতা এবং সৃজনশীল উৎকর্ষতা নিশ্চিত করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।



