বাংলাদেশের রপ্তানি পরিসরে গার্মেন্টসের আধিপত্য দীর্ঘদিনের কথা, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চামড়া ও জুতা শিল্পের বিকাশ আন্তর্জাতিক বাজারে নজর কাড়ছে। এই সেক্টরটি মূলত কাঁচা চামড়া রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত পণ্য রপ্তানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
শিল্পের পরিবর্তনকে প্রমাণ করে ২০২৫ সালের তথ্য, যেখানে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী চামড়া ও জুতা শিল্পে শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে জুতা রপ্তানিতে দেশটি ১৮তম বৃহত্তম রপ্তানিকারক হিসেবে তালিকাভুক্ত, এবং আর্থিক বছর ২০২৪‑২৫-এ রপ্তানি আয় ৩৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংখ্যাগুলো শিল্পের দ্রুত উত্থানকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।
সংখ্যা যদিও শক্তিশালী সূচক, তবে শিল্পের গতিবিধি কেন এত তীব্র তা বোঝার জন্য পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করা দরকার। বহু শিল্প বিশেষজ্ঞের মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং সরকারী নীতির সমন্বয় এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা এবং বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই প্রবণতার এক বাস্তব উদাহরণ হল ক্র্যাফটম্যান ফুটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজের কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স অফিসার মোঃ সাদ্দাম হোসেনের গল্প। তিনি কানাডায় ১৮ বছর বসবাসের পর স্থিতিশীল চাকরি এবং সন্তানসহ স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন ত্যাগ করে দেশের মাটিতে ফিরে এসে পিতার সঙ্গে জুতা কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
হোসেনের প্রথম দিনগুলোতে তিনি শিখেছিলেন যে এক জোড়া জুতা তৈরিতে কতজন কর্মীর হাত জড়িত থাকে। ফ্যাক্টরি মেঝে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বুঝতে পারলেন, নকশা, কাটিং, সেলাই, পলিশ এবং প্যাকেজিং—প্রত্যেক ধাপে বিশেষজ্ঞের অবদান থাকে। এই প্রক্রিয়ার জটিলতা তাকে শিল্পের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে।
তার সৃজনশীলতা এই পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের মধ্যে বিকশিত হয়েছে এবং তিনি দ্রুত লক্ষ্য করেন, বাংলাদেশি ভোক্তারা ফ্যাশন ট্রেন্ডে অত্যন্ত সংবেদনশীল। স্থানীয় বাজারে নতুন ডিজাইন ও স্টাইলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, যা রপ্তানি পণ্যের গুণগত মান ও নকশা উন্নত করার প্রেরণা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, চামড়া ও জুতা শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশাল, তবে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। কাঁচামালের মূল্য ওঠানামা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন এবং পরিবেশগত মানদণ্ডের কঠোরতা শিল্পকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় উৎপাদন প্রক্রিয়ায় টেকসই প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, গার্মেন্টসের ছায়ায় লুকিয়ে থাকা চামড়া ও জুতা শিল্প এখন রপ্তানির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ২০২৪‑২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং ১৮তম বৃহত্তম রপ্তানিকারক হিসেবে অবস্থান এই সেক্টরের শক্তি প্রমাণ করে। সঠিক নীতি সমর্থন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং বাজারের প্রবণতা অনুযায়ী পণ্য উন্নয়ন হলে বাংলাদেশ এই শিল্পে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও এগিয়ে যাবে।



