শনিবার দুপুরে রেডিও ডক্টর রোকেয়া মিলনায়তনে সুজনের আয়োজনে ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার তার বক্তব্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন সত্ত্বেও গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মৌলিক নীতি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
ড. বদিউল আলমের মতে, স্বাধীনতার পরেও দেশের শাসনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তন না হওয়ায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা দেখা দিচ্ছে। তিনি বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকের তিন জোটের রূপরেখা, যা ঐ সময়ের রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তি ছিল, তা এখনো কার্যকর না হওয়ার কথা তুলে ধরেন। এই রূপরেখা না মেনে চলা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এছাড়া, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা দমন হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ঐ আন্দোলনের মূল চেতনা যদি সঠিকভাবে রক্ষা না করা হয়, তবে তা ভবিষ্যতে পুনরায় উদ্ভূত হতে পারে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থির করতে পারে।
শহীদদের রক্তের ঋণ শোধের দায়িত্ব সকল নাগরিকের উপর আরোপ করার আহ্বান ড. বদিউল আলম করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রত্যেকেরই দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে, যাতে শিকারের স্মৃতি সৎভাবে সম্মানিত হয় এবং তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে তিনি কিছু অঙ্গীকারের ভিত্তিতে দায়িত্ব গ্রহণকারী হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার নির্বাচনের স্বচ্ছতা, সংস্কার এবং বিচারিক ব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সরকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
ড. বদিউল আলমের মতে, নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হল নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করা। তবে তিনি এটাও জোর দিয়ে বলেন যে, শুধুমাত্র স্বচ্ছ নির্বাচনই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয়; এটি কেবলমাত্র গণতন্ত্রের যাত্রার সূচনা মাত্র।
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিশ্চিত করতে সংস্কার অপরিহার্য, এ কথাটি তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে আইনগত, প্রশাসনিক ও সামাজিক সংস্কার ছাড়া গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব নয়।
কমিশনের কাজের ব্যাপারে ড. বদিউল আলম স্বীকার করেন যে, এখনো সম্পূর্ণ সন্তোষজনক ফলাফল অর্জিত হয়নি, তবে বর্তমান কমিশন কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষপাতদুষ্ট নয়। তিনি বলেন, কমিশন কোনো একক সরকারের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত নয়, ফলে তার স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার সম্ভাবনা বেশি।
কমিশনের স্বতন্ত্রতা বজায় থাকলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত হবে, এ বিষয়ে তিনি আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হল নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নীতি বাস্তবায়ন করা।
ড. বদিউল আলমের মন্তব্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে নির্বাচনী সংস্কার, বিচারিক স্বচ্ছতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বাস্তবায়িত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, যদি এই মৌলিক কাঠামোগুলো সঠিকভাবে গড়ে তোলা না হয়, তবে দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক সমৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।
অবশেষে, ড. বদিউল আলম মজুমদার উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের দায়িত্ব পালন করে গণতন্ত্রের সঠিক পথে অগ্রসর হতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, স্বচ্ছ নির্বাচন, নিরপেক্ষ কমিশন এবং সময়োপযোগী সংস্কার একসাথে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে সুদৃঢ় করবে।



